রতন রায়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
তারিখ: ১০ জুলাই ২০২৬
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের বালারহাট এলাকায় অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো একগম্বুজবিশিষ্ট শিব মন্দিরটি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে তার অমূল্য পোড়ামাটির নান্দনিক কারুকার্য। সংরক্ষণের অভাবে, প্রত্নতাত্ত্বিক তদারকির অনুপস্থিতিতে এবং স্থানীয়দের অপরিকল্পিত সংস্কারের কারণে দেয়ালের ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটার অলংকরণ বিলীন হওয়ার পথে।
২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মন্দিরটিকে ‘প্রাচীন পুরাকীর্তি’ হিসেবে গেজেটভুক্ত করলেও এ তথ্য সম্পর্কে অবগত নন স্থানীয় সেবায়েত, মন্দির পরিচালনা কমিটি ও সাধারণ মানুষ। মন্দির চত্বরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো সাইনবোর্ড না থাকায় এটি সরকারি সংরক্ষিত স্থাপনা এ বিষয়টি অজানাই রয়ে গেছে সবার কাছে।
জানা যায়, নাওডাঙ্গা পরগনার জমিদার বাহাদুর শিব প্রসাদ বক্সী প্রায় ৩০০ বছর আগে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার একগম্বুজবিশিষ্ট এ মন্দিরে জমিদারি আমল থেকেই নিয়মিত শিবপূজা হয়ে আসছে। দেয়ালের পোড়ামাটির নান্দনিক কারুকাজ তৎকালীন শিল্পরুচি ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন।
আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত পুরাকীর্তিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কোনো সংস্কার করা যায় না। কিন্তু এ বিষয়ে অজ্ঞাত থেকে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে প্লাস্টার, রং ও অন্যান্য সংস্কারকাজ করছেন। এতে আদি স্থাপত্যশৈলী নষ্ট হচ্ছে এবং শতাব্দীপ্রাচীন টেরাকোটার কারুকার্য ঢাকা পড়ছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মন্দিরের সেবায়েত সুরেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘শুনেছিলাম মন্দিরটিকে প্রাচীন পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি বাস্তবে হয়েছে কি না, তা কখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারিনি। এখানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো সাইনবোর্ডও নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি কোনো তদারকি না থাকায় আমরা না বুঝেই মাঝে মাঝে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। এতে মন্দিরের দেয়ালের প্রাচীন পোড়ামাটির কারুকার্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি সুশীল চন্দ্র রায় জানান, প্রায় ৯-১০ বছর আগে রংপুর থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মন্দির পরিদর্শন করেছিলেন, এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তিনি বলেন, ‘মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়া হয়েছে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। এখানে সাইনবোর্ডও নেই। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্তরা আসেন। মন্দির টিকিয়ে রাখতেই আমরা বাধ্য হয়ে সংস্কার করেছি। যদি আগে জানতাম, তাহলে নিজেরা কোনো সংস্কার করতাম না।’
৮০ বছর বয়সী ভক্ত নির্মল চন্দ্র বর্মণ, যিনি শৈশব থেকে এখানে পূজা করে আসছেন, বলেন, ‘এত প্রাচীন মন্দির আশপাশের জেলাতেও নেই। এখানে পূজা করলে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। দেয়ালের অসাধারণ নকশা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা জরুরি।’
কুড়িগ্রাম সদর থেকে আসা দর্শনার্থী নন্দন কুমার রায় বলেন, ‘অনেকের মুখে শুনে দেখতে এসেছি। এটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। এর টেরাকোটার শিল্পকর্ম সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।’
স্থানীয় সাংবাদিক অনিল চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমি নিয়মিত এখানে আসি এবং পূজা করি। কিন্তু কখনো জানতে পারিনি যে এটি গেজেটভুক্ত প্রাচীন পুরাকীর্তি। অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড ও নিয়মিত তদারকি থাকলে স্থানীয়রা নিজেরা সংস্কার করতেন না, আর ঐতিহ্যবাহী কারুকার্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতো না।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতিশ্রুতি-
রংপুর বিভাগীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল বলেন, ‘মন্দিরটি গেজেটভুক্ত প্রাচীন পুরাকীর্তি। সেখানে আমাদের সাইনবোর্ড থাকার কথা কেন এখনো স্থাপন হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে।’ তিনি জানান, ‘অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কোনো সংস্কার করা যায় না। ঐতিহাসিক পোড়ামাটির কারুকার্য ঢেকে দেওয়া বা নষ্ট করা যাবে না।’ খুব শিগগিরই মন্দির পরিদর্শন, সাইনবোর্ড স্থাপন, সংরক্ষণ জোরদার এবং স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে বালারহাটের এই শিব মন্দিরটি ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও স্থাপত্যগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ সংরক্ষণ না হলে অচিরেই মন্দিরটির শতাব্দীপ্রাচীন টেরাকোটার শিল্পকর্ম চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


