মো:সিপাউর রহমান কুলাউড়া সংবাদদাতা।
বাংলাদেশের চিকিৎসাঙ্গনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন ডা. মুহাম্মদ সাঈদ এনাম (Muhammad Sayed Inam)। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ও নিউরোসাইকিয়াট্রি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ গর্বের বিষয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করা এই চিকিৎসক ও গবেষকের বাড়ি ও জন্মস্থান মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়।
ডা. মুহাম্মদ সাঈদ এনাম MBBS (Dhaka Medical College) এবং MPhil in Psychiatry ডিগ্রিধারী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি (ব্রেইন, স্নায়ু ও মনোরোগ) বিভাগে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাদান ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অব সাইকিয়াট্রি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গবেষণায় ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি
ডা. সাঈদ এনামের গবেষণাকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—মানসিক রোগকে কেবল মনোরোগবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে Neurology, Neuro-Psychiatry, Medicine, Ageing এবং Psychosocial factors-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা।
তাঁর ResearchGate প্রোফাইলে বর্তমানে ১৬টি প্রকাশনা (publication) তালিকাভুক্ত রয়েছে। এসব গবেষণার মধ্যে রয়েছে স্ট্রোক-পরবর্তী মানসিক জটিলতা, বিরল মাথাব্যথা, মস্তিষ্কের টিউমারের সঙ্গে মানসিক উপসর্গের সম্পর্ক, সিজোফ্রেনিয়া স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের বিরল উপসর্গ এবং মানসিক রোগের ওষুধ গ্রহণে অনিয়মসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার স্বীকৃতি
তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোর একটি হলো “Psychiatric Morbidity Among the Patients of First Ever Ischaemic Stroke”। প্রথমবার ইস্কেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক জটিলতা বা Psychiatric Morbidity মূল্যায়ন করা হয়েছে এই গবেষণায়।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উপস্থাপিত হয়। Royal College of Psychiatrists International Congress 2022, এডিনবরায় এ গবেষণার উপস্থাপনা হয়। পরবর্তীতে গবেষণাটি BJPsych Open-এ প্রকাশিত হয়। এর আগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত American Psychiatric Association-এর সম্মেলনেও তাঁর এই গবেষণাকর্ম উপস্থাপিত হয়।
মস্তিষ্কে ৫০ বছর শার্পনেল নিয়ে বেঁচে থাকা—বিরল কেইস রিপোর্ট
ডা. সাঈদ এনামের গবেষণার আরেকটি ব্যতিক্রমী কাজ হলো “Surviving Fifty Years With Shrapnel Within the Brain”। এতে যুদ্ধের সময় মস্তিষ্কে প্রবেশ করা শার্পনেল নিয়ে প্রায় পাঁচ দশক বেঁচে থাকা এক নারীর বিরল ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
এই কেইস রিপোর্টও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপিত ও প্রকাশিত হয়। এছাড়া “Sexual Hallucination: A Rare Type of Tactile Hallucination Found in Schizophrenia Spectrum Disorder” শীর্ষক তাঁর আরেকটি বিরল কেইস হিস্ট্রিও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অঙ্গনে আগ্রহ তৈরি করে।
বিরল নিউরোলজিক্যাল ও সাইকিয়াট্রিক উপসর্গ নিয়েও গবেষণা
তাঁর গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হলো বিরল Neurological ও Psychiatric Presentation। “Hypnic Headache: A Rare Type of Primary Headache Disorder” শীর্ষক প্রবন্ধে ঘুমের মধ্যে দেখা দেওয়া বিরল ধরনের মাথাব্যথা নিয়ে একটি কেইস রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়েছে। এটিও BJPsych Open-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া “A Case of Meningioma Presenting with Psychiatric Symptoms” শীর্ষক গবেষণায় মস্তিষ্কের Meningioma কীভাবে বিভিন্ন Psychiatric Symptoms নিয়ে প্রকাশ পেতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি ২০২৩ সালে American Journal of Biomedical Science & Research-এ প্রকাশিত হয়।
মানসিক রোগের ওষুধ গ্রহণ নিয়েও গবেষণা
ডা. সাঈদ এনামের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Psychotropic Medication Adherence। সহগবেষকদের সঙ্গে তিনি Major Psychiatric Disorders-এ আক্রান্ত রোগীদের মানসিক রোগের ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ না করার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। এ গবেষণাটি Bangladesh Journal of Psychiatry-তে প্রকাশিত হয়েছে।
চিকিৎসক, শিক্ষক ও গবেষক—তিন পরিচয়ে অনন্য
ডা. মুহাম্মদ সাঈদ এনামের পেশাগত পরিচয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—তিনি একই সঙ্গে একজন চিকিৎসক, শিক্ষক ও গবেষক। রোগীর চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের শিক্ষা দেওয়া এবং বাস্তব ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় রূপ দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
তাঁর গবেষণাকর্মে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে Psychiatry, Neuro-Psychiatry, Neurology, Medicine এবং Psychosocial factors-এর পারস্পরিক সম্পর্ক। ফলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল ও বিরল বিষয়গুলোকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কুলাউড়ার সন্তান হিসেবে ডা. মুহাম্মদ সাঈদ এনামের এই চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক পথচলা নিঃসন্দেহে স্থানীয় মানুষের জন্য গর্বের। দেশ-বিদেশে তাঁর গবেষণা ও চিকিৎসাসেবার এই অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা কুলাউড়াবাসীর।


