ফাহিম হোসেন রিজু, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে এক পরিবারের বসতবাড়িতে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মালামাল তুলে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তল্লাশি চালিয়ে কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য বা অবৈধ কিছু না পেয়ে, শেষমেষ ওই বাড়ির এক তরুণীর ব্যক্তিগত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন ও ঘরের একটি টর্চ লাইট নিয়ে আসার ঘটনা ঘটেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা, গ্রেফতার কিংবা আইনগত জব্দ তালিকা (সিজার লিস্ট) ছাড়াই গভীর রাতে সাধারণ এক তরুণীর ফোন তুলে নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
গত বুধবার (১৫ জুলাই) রাত আনুমানিক ১১টার সময় উপজেলার বুলাকীপুর ইউনিয়নের কৃষ্টরামপুর এলাকার ফিরু নামের এক ব্যক্তির বসতবাড়িতে এই বিতর্কিত অভিযানটি পরিচালনা করেন ঘোড়াঘাট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নজরুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে ফিরুর বসতবাড়িতে আকস্মিক হানা দেয় এসআই নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। ওই সময় ঘরের পুরুষ সদস্যরা কেউ উপস্থিত ছিলেন না। পুলিশ সদস্যরা পুরো বাড়ি ওলটপালট করে তল্লাশি চালালেও দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য বা অবৈধ মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকি এই ঘটনায় সন্দেহভাজন ফিরুকেও তারা গ্রেফতার বা আটক করেনি।
ফিরুর স্ত্রীর অভিযোগ, মাদক বা অপরাধের কোনো আলামত না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশ ঘরের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করে। একপর্যায়ে কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা জব্দ তালিকা ছাড়াই ফিরুর ছোট মেয়ের ব্যবহৃত একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন (যা ফিরু ব্যবহার করেন বলে পুলিশ সন্দেহ করে) এবং ঘরের একটি কালো টর্চ লাইট জোরপূর্বক তুলে নিয়ে আসে পুলিশ।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী পরিবারটি থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশ তাদের জানায় যে, ফোনটি ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে, এজন্য তাদের থানায় আসার প্রয়োজন নেই এবং তাদের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তা পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তবে কোনো অপরাধ বা আলামত ছাড়া কেন এই মালামাল থানায় নিয়ে যাওয়া হলো, তার কোনো আইনগত সদুত্তর দেয়নি পুলিশ।
এই রহস্যজনক অভিযানের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত এসআই মো. নজরুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সামনে জবাবদিহিতা এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “আমি এখন ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলবো।” এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে, নিজের অধস্তন অফিসারের এমন আইনবহির্ভূত ও বিতর্কিত অভিযানের বিষয়ে শুরুতে অন্ধকারে ছিলেন খোদ থানার শীর্ষ কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”
পরবর্তীতে বিস্তারিত জানতে চাইলে ওসি মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “অভিযানের বিষয়ে আমি এই মুহূর্তে পুরোপুরি সঠিক তথ্য জানি না। সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল, তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের কাছ থেকে জেনে বিস্তারিত বলতে পারব। তবে জব্দকৃত মোবাইলটি যদি মাদক ব্যবসায়ীর পরিবারের কারও হয়ে থাকে, তবে তার প্রকৃত মালিককে থানায় এসে যোগাযোগ করতে বলুন; যথাযথ নিয়ম মেনে সেটি হস্তান্তর করা হবে। আর আপনার (সাংবাদিক) যদি এই ঘটনার বিষয়ে আরও কোনো তথ্য জানার বা স্পষ্ট হওয়ার প্রয়োজন থাকে, তবে সরাসরি থানায় এসে কথা বলতে পারেন।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো মালামাল জব্দ করতে হলে ঘটনাস্থলেই স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে জব্দ তালিকা তৈরি করে তার কপি বাড়ির মালিককে দিতে হয়। কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া সত্ত্বেও এবং গৃহকর্তাকে গ্রেফতার না করে, তল্লাশির নামে তরুণীর মোবাইল ও ঘরের টর্চ লাইট নিয়ে আসা স্পষ্টতই ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের চরম লঙ্ঘন।
অভিযানের নামে পুলিশের এই ধরণের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ঘোড়াঘাটের সাধারণ মানুষের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি এখন তাদের মালামাল অবিলম্বে ফেরত পেতে জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।
ছবির ক্যাপশন: অভিযুক্ত উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নজরুল ইসলাম

