আনিসুর রহমান মানিক , পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধ :
পঞ্চগড়, ৯ জুলাই ২০২৬: পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের যুগিকাটা গ্রামে দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, কালীমন্দিরের মূর্তি ভাঙচুরের অভিযোগ, এক মুসলিম যুবককে মারধর এবং পরবর্তীতে হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুরের অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ৬ নম্বর ধামোর ইউনিয়নের যুগিকাটা গ্রামে বিরোধপূর্ণ জমিতে চাষাবাদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জাকির হোসেনের সঙ্গে অনিল পাল ও তার স্বজনদের বিরোধের একপর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় কালীমন্দিরে থাকা একটি মূর্তির মাথা জাকির হোসেনের গলায় ও হাতে ঝুলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ প্রচার করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ‘Shanto Pal’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে ঘটনাটি মন্দির ভাঙচুরের অভিযোগ হিসেবে লাইভ সম্প্রচার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রায় ৬ একর ৬৬ শতক জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ দীর্ঘদিনের। রাম প্রসাদ পাল ও নরেন্দ্র পালের উত্তরাধিকারীরা ১৯৭৭ সালে জমিটির নামজারি পান। পরে প্রতিবেশী লক্ষ্মীচরণ ও ধনেশ্বর ওই জমির মালিকানা দাবি করে ২০১৬ সালে দেওয়ানি মামলা করেন। মামলার রায়ে অনিল পক্ষের পক্ষে সিদ্ধান্ত এলেও পরবর্তী আপিল এখনও বিচারাধীন রয়েছে। অন্যদিকে নামজারি সংক্রান্ত আপিলগুলো বিভিন্ন পর্যায়ে খারিজ হওয়ার পর সর্বশেষ ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত লক্ষ্মীচরণের পক্ষে যায়।
পুলিশ জানায়, কয়েক মাস আগে লক্ষ্মীচরণ তার দাবি করা জমি স্থানীয় জাকির হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। ঘটনার দিন অনিল পক্ষ ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করতে গেলে জাকির বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।
পুলিশের তথ্যমতে, বিরোধপূর্ণ জমির মধ্যে অবস্থিত কালীমন্দিরটি কয়েক মাস আগে নির্মিত হয় এবং এটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য রয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংঘর্ষে আহত জাকির হোসেন বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত এবং একটি হাড় ভেঙে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ৯টি বাড়ি ও ঘরে ভাঙচুর, আসবাবপত্র নষ্ট এবং নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অপর পক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, ঘটনাটি সাজানো হতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তথ্য সংগ্রহ চলছে।
ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), আটোয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পুলিশ সুপার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলেন এবং সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যুগিকাটা, ডাঙ্গিরহাট বঙ্গবন্ধু কলেজ গেট ও কালীবাড়ি চৌরাস্তা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সম্প্রীতি সভার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তি এবং বাড়িঘর ভাঙচুরে নেতৃত্বদানকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।


