উমংনু মারমা, জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা বান্দরবানের থানছি। এর মধ্যেও আরও দুর্গম দুটি ইউনিয়ন হলো তিন্দু ও রেমাক্রী। উপজেলা সদর থেকে এ দুই ইউনিয়নের দূরত্ব ৯০ কিলোমিটারেরও বেশি। কোথাও সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সীমিতভাবে বিদ্যুতের আলো থাকলেও নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক। চলাচলের একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত নৌকা। এমন এলাকায় গর্ভবতী মায়েদের ভরসার নাম হয়ে উঠেছেন স্বাস্থ্যকর্মী ওয়ংনুচিং মার্মা।
গত তিন বছরে ওয়ংনুচিং অন্তত ৬৫ জন প্রসূতির নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন। রেমাক্রী বাজারের পেছনে বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি তিন কক্ষের ছোট্ট একটি ঘরেই চলছে ‘রেমাক্রী অস্থায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেবা কেন্দ্র’। দিনরাত অবিরাম সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ওয়ংনুচিং রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্যের স্ত্রী। তার দুই সন্তান আছে। বড় ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে, মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তারা দুজনেই বান্দরবান সদরে থেকে পড়াশোনা করছে। কিন্তু সন্তানদের রেখে তিনি রেমাক্রির দুর্গম এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অবিরাম ছুটে চলছেন মায়েদের সেবায়। মাসে একবার সময় করে পরিবারে গিয়ে কিছুটা সময় কাটান, তারপর আবার ফিরে আসেন গ্রামীণ সেবায়।
রেমাক্রী ইউনিয়নে রয়েছে ৯০টিরও বেশি পাহাড়ি গ্রাম। মারমা, ত্রিপুরা, মো, বম, খুমী, খিয়াংসহ নানা জনগোষ্ঠীর বসবাস এখানে। এসব গ্রামের মানুষের যাতায়াত শুধু নৌকা বা হাঁটাপথে। অসুস্থ হলে বা প্রসববেদনা উঠলে উপজেলা সদর পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে মাঝপথে অনেক প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটেছে।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে হাতে-কলমে চিকিৎসা আর নরমাল ডেলিভারির জন্য এখন ওয়ংনুচিং মার্মাই ভরসার নাম। স্থানীয়রা তাকে স্নেহভরে ডাকেন ‘ওয়ানু দি’।
ওয়ংনুচিং মার্মা বলেন, এখানকার মানুষ হতদরিদ্র। সিজার করাতে তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তারা আস্থা নিয়ে আমার কাছে আসেন। কষ্ট হয়, তবে যখন একজন মা সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দেন, সব কষ্ট ভুলে যাই। এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। প্রতিটি মা ও শিশু সুস্থ আছে।
রেমাক্রী বাজারপাড়ার স্থানীয়রা জানান, ক্লিনিকে নিয়মিত প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা দেওয়ার ফলে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছে। একইসঙ্গে অনেক খরচও বেঁচে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘মা-মণি প্রকল্প’ ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে চালু হয় রেমাক্রী অস্থায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেবা কেন্দ্র। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে কার্যক্রম চলছে।
রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মার্মা বলেন, আমার ইউনিয়নে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসবাস। দুর্গমতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হলেও ছোট্ট এই ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারি হওয়ায় গরিব নারীরা উপকৃত হচ্ছেন। কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে উন্নয়ন করা জরুরি।
এ ব্যাপরে বান্দরবান পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ-নেটওয়ার্কবিহীন এ রকম প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়ংনুচিং মার্মা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে গর্ভবতী নারীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অস্থায়ী কেন্দ্রটিকে স্থায়ী করার প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে যেখানে মাতৃত্ব মানেই ছিল ভয় আর অনিশ্চয়তা, কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে সেখানে আশার আলো হয়ে উঠেছেন ওয়ংনুচিং মার্মা। রেমাক্রীতে মাতৃত্বের আরেক নাম এখন ওয়ংনুচিং মার্মা।


