এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
কক্সবাজারের প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে নিজের প্রকৃত নাম ও পরিচয় গোপন করে শ্বশুর-শাশুড়িকে মা-বাবা বানিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, ওই ভুয়া এনআইডিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অভিযুক্ত ব্যক্তি মানবপাচার ও প্রাণঘাতী মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও নিশ্চিত করেছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ভুয়া এনআইডিটি অবিলম্বে বাতিল ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং উপজেলা নির্বাচন অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর চিত্র
ইউএনও কার্যালয়ে প্রেরিত দাপ্তরিক চিঠি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ভুয়া এনআইডিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম দেওয়া হয়েছে মো: রফিক (এনআইডি নং- ৩৭৭৫—৯৩২, জন্ম তারিখ: ০১ মার্চ ২০০২)। সেখানে তার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে— গ্রাম: পূর্ব পাড়া, ওয়ার্ড নং- ৬, ডাকঘর: সেন্টমার্টিন-৪৭৬২, উপজেলা: টেকনাফ, জেলা: কক্সবাজার। ওই এনআইডিতে আব্বাস আলীকে পিতা এবং ফাতেমা খাতুনকে মাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে জালিয়াতির বিস্ফোরক তথ্য। প্রকৃতপক্ষে ওই ব্যক্তির নাম মো: হাফেজুর রহমান (হাজু)। তার জন্মদাতা পিতার নাম মৃত আলী এবং মাতার নাম মৃত আনোয়ারা বেগম। অভিযুক্ত হাজু ও তার পরিবার মূলত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, হাজু তার রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন রেখে কৌশলে শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে ব্যবহার করে শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজ মা-বাবা হিসেবে পরিচয় দেন। পরবর্তীতে স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান, গ্রাম পুলিশ ও সংরক্ষিত নারী মেম্বারের নাম, সিল এবং স্বাক্ষর জাল করে গোপনে এই এনআইডি তৈরি করেন।
এনআইডি ঢাল বানিয়ে মানব পাচার ও মাদক কারবার
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান-২ ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই পত্রে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানানো হয়, ভুয়া বাংলাদেশি পরিচয়পত্র পাওয়ার পর থেকে মো: হাজু বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
এই প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে হাজুর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে (০১৫৪০—১৫২) কথা বলে জানা যায়, তিনি দীর্ঘ দিন ধরে কোস্টগার্ডের বোট ড্রাইভার ও সোর্স হিসেবে কাজ করার সুযোগে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ভাই লাবেকা রফিকের সহযোগিতায় তিনি মানব পাচার চক্র গড়ে তোলেন।
তার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের এসএসসি-২৬ পরীক্ষার্থী শহীদুল ইসলাম (শানু)। থাইল্যান্ডের কারাগারে বন্দি আছে বলে শানুকে মুক্ত করার প্রলোভন দেখিয়ে তার দাদার কাছ থেকে নগদে ৩০ হাজার টাকা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ৩ লাখ ৬৯ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন হাজু। অথচ টাকা নেওয়ার পরও শানুর কোনো খোঁজ পরিবারকে দেওয়া হয়নি; উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। টাকা লেনদেন এর তথ্য প্রমাণ প্রতিবেদক এর হাতে সংরক্ষিত আছে।
দ্রুত তদন্ত ও এনআইডি বাতিলের দাবি জানিয়ে বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও এনআইডি ব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে টেকনাফ উপজেলা বিশেষ কমিটিকে সরেজমিন তদন্তের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সাথে ভূয়া এনআইডিটি দ্রুত বাতিল এবং অভিযুক্ত হাজু ওরফে রফিকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আকুল আবেদন জানানো হয়।
৬নং সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য (৬নং ওয়ার্ড) মো: ছৈয়দ আলম, গ্রাম পুলিশ মো: ইসমাইল এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামের যৌথ স্বাক্ষরে এই লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অনুলিপি দেওয়া হয়েছে উপজেলা নির্বাচন অফিসেও।
এ ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুততম সময়ে এই জালিয়াতি চক্রের মূল উপড়ে ফেলাসহ ভুয়া এনআইডিধারী রোহিঙ্গাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

