এম কে হাসান জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে উগ্র জনপদের ত্রাস হিসেবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করেছে কুখ্যাত রিদুয়ান বাহিনী। টেকনাফের একসময়ের আতঙ্কের নাম কুখ্যাত আব্দুল মালেক প্রকাশ মালেক ডাকাতের মৃত্যুর পর, তার ছেলে রিদুয়ানের নেতৃত্বে এই অপরাধ সাম্রাজ্য নতুন রূপে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে গহীন পাহাড়ের আড়ালে সে কীভাবে তার অপরাধ নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে এবং লোকালয়কে জিম্মি করে নৃশংস অপহরণ বাণিজ্য চালাচ্ছে, তার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রতিবেদক এর হাতে আসা এক্সক্লুসিভ ছবিতে।
উক্ত ছবি গুলোতে দেখা যায়, রিদুয়ান অত্যন্ত সাবলীল ও উদ্ধত ভঙ্গিতে অত্যাধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করছে। একটি ছবিতে তাকে বাঁশ দিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী পাহাড়ি আস্তানার সামনে স্ট্রাইপ গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়। তার হাতে রয়েছে একটি কালো রঙের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। তার চোখে-মুখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তোয়াক্কা না করার এক ধরণের উদ্ধত ভাব স্পষ্ট। অন্য একটি আধো-অন্ধকার টিনের বেড়া দেওয়া ঘরের ভেতরের ছবিতে তাকে কালো লেদার জ্যাকেট পরা অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে তার এক হাতে একটি কালো রঙের আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্য হাতে একটি সিলভার রঙের পিস্তল রয়েছে। তার ঠিক সামনে মেঝেতে পড়ে আছে লম্বা নলের আরেকটি দেশীয় এলজি বা বন্দুক।
স্থানীয় ও বিশ্বস্ত সূত্র গুলো নিশ্চিত করেছে, এই ছবি গুলো টেকনাফের বাহারছড়া এলাকার দুর্গম পাহাড়ি আস্তানায় তোলা। বাবার অপরাধ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পুরোনো নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে রিদুয়ান উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা সশস্ত্র রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিজের বাহিনীতে যুক্ত করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই বাহিনীর অপরাধের সংঘটিত করার ধরন অত্যন্ত সুসংগঠিত। উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গহীন পাহাড়ে অপহৃতদের জিম্মি করে রাখা ও পাহারা দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে, রিদুয়ানের স্থানীয় সহযোগীরা লোকালয়ে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ধনী ব্যক্তি, পানের বরজ ও ধানের জমিতে কাজ করতে যাওয়া চাষীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে এবং মূল বাহিনীর কাছে তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
রিদুয়ানের হাতে এসব ভারী অস্ত্রের ছবি প্রকাশ্যে আসার পর বাহারছড়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই সংবেদনশীল যে, দিনের আলোতেও মানুষ একা চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে পানের বরজ ও ধানের জমিতে কাজ করতে যাওয়া কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি অপহরণের শিকার হচ্ছে। ফলে, জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনেকেই মাঠে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
সন্তানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকেরা চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই তাদের সন্তানদের একা বাইরে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। পুরো এলাকায় এক অলিখিত কারফিউর মতো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাহারছড়া ও জাহাজপুরার দুর্গম ও গহীন পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী জিম্মিশালা। অপহৃতদের সেখানে নিয়ে গিয়ে চালানো হয় অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন। নির্যাতনের সেই আর্তনাদের অডিও বা ভিডিও রেকর্ড করে স্বজনদের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারলে অপহৃতদের লাশ মিলছে পাহাড়ের গিরিখাতে, আর টাকা দিলে রাতের অন্ধকারে চোখ বেঁধে লোকালয়ের কাছাকাছি কোথাও ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদক এর হাতে আসা অস্ত্রসহ রিদুয়ানের এই ছবি গুলো অপহৃতদের ওপর তার নৃশংসতা ও শক্তিরই জানান দিচ্ছে।
যদিও পুলিশ ও র্যাব ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত পাহাড়ে নজরদারি ও অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু ভৌগোলিক দুর্গমতা, পাহাড়ের খাঁজ এবং ঘন বনের কারণে এই অপরাধীচক্র বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে পার পেয়ে যাচ্ছে।
টেকনাফের এই দীর্ঘমেয়াদী জিম্মিদশা থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণ কেবল মৌখিক আশ্বাস বা সাময়িক অভিযান চান না। বাহারছড়া এলাকার সর্বস্তরের মানুষ অনতিবিলম্বে রিদুয়ান বাহিনীর সব সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং পাহাড়ি অপরাধীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও জোরালো যৌথ চিরুনি অভিযানের জোর দাবি জানিয়েছেন।


