জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক শাস্তিমূলক বদলির আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাত্র ১ বছর ৫ মাসের মাথায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ফিরে এসেছেন বহুল বিতর্কিত কর্মচারী তুষার কান্তি পাল। শুধু ফিরে আসাই নয়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের এক বিতর্কিত আদেশে ১৩তম গ্রেডের এই কর্মচারীকে এক লাফে ১০ম গ্রেডের (২য় শ্রেণীর গেজেটেড) প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় দপ্তরের এই নজির বিহীন মেহেরবানি এবং স্ববেতনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে বসানোর পেছনে সরকারি চাকরি বিধির গুরুতর লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
*অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত বাইপাস: ঢাকা থেকে শাস্তি, চট্টগ্রাম থেকে পুরস্কার*
ঘটনার পটভূমি পর্যালোচনায় জানা যায়, গত ৪ মে ২০২৫ তারিখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে তুষার পালের বিরুদ্ধে নানা প্রশাসনিক অনিয়ম ও সিন্ডিকেট চালানোর সত্যতা পান। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে জনস্বার্থে রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয় (স্মারক নং-স্বাঃ অধিঃ/প্রশা-৩/৩য় শ্রেনী/বিবিধ/৩১৮/২৫/১৯৭)। কিন্তু যে দপ্তর শাস্তিমূলক বদলি করল, সেই অধিদপ্তরের আদেশকে তোয়াক্কা না করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় থেকে এক আদেশে (স্মারক নং-বিংশঃস্বাঃচিঃ/৪-৪(চট্ট ও কক্স)/প্রশা-২০২৬/১৫৮৪৪/৮) তাঁকে পুনরায় একই সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়। অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক দপ্তর থেকে এভাবে উল্টে দেওয়াকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার চরম অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
*১৩তম থেকে ১০ম গ্রেড: বিধিমালার মারাত্মক লঙ্ঘন*
জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী তুষার পালের মূল পদ ‘প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক’, যা ১৩তম গ্রেডের (৩য় শ্রেণীর কর্মচারী)। পক্ষান্তরে ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ পদটি ১০ম গ্রেডের (২য় শ্রেণীর গেজেটেড)। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী, ১৩তম গ্রেড থেকে সরাসরি ১০ম গ্রেডের কোনো পদে কাউকে পদায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। অভিজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ বদলি নয়, বরং প্রশাসনিক ক্ষমতা অপব্যবহার করে একধাপ উল্লম্ফন (Leapfrog)।
বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (DPC) এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন (PSC)-এর অনুমোদন ছাড়া কেবল আদেশে ‘নিজ বেতনে’ ও ‘শর্তসাপেক্ষ’ কথাটি লিখে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা বানানো সরকারি প্রমোশন নীতিমালার সঙ্গে স্পষ্ট প্রতারণা।
*তুষার পালের পদায়ন চিত্র:-*
এক নজরে আগের পদ ছিল প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক (১৩তম গ্রেড, ৩য় শ্রেণী) শাস্তিমূলক বদলীকৃত আর বর্তমান পদায়নকৃত পদ হচ্ছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (১০ম গ্রেড, ২য় শ্রেণী গেজেটেড), যেখানে ঘটেছে ব্যত্যয় বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি (DPC) ও পাবলিক সার্ভিস কমিশন (PSC) অনুমোদন ছাড়া সরাসরি পদোন্নতিতুল্য পদায়ন ।ব্যত্য : DPC ও PSC অনুমোদন ছাড়া সরাসরি পদোন্নতিতুল্য পদায়ন
*দায়িত্ব হস্তান্তরে অসদাচরণ ও বিধি লঙ্ঘন*
ইতিপূর্বে বদলির আদেশ হলেও তুষার পাল তাঁর পদ ও দায়িত্ব হস্তান্তরে চরম তালবাহানা করেন। এতে পদে আসা নতুন কর্মচারী ইসহাক নোমান দায়িত্ব নিতে না পেরে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মং টিন ঞো বরাবর লিখিত অভিযোগ জানান, যা প্রতিবেদকের কাছে রক্ষিত আছে । সেখানে উল্লেখ করা হয়, ৮ মে ২০২৫ তারিখে যোগদানের পর তিন মাস পার হলেও তিনি দায়িত্ব বুঝে পাননি। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারা অনুযায়ী এ ধরনের আচরণ দণ্ডনীয় “অসদাচরণ” (Misconduct)। কিন্তু শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে উল্টো তিনি পুরস্কৃত হলেন।
*জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ব্যত্যয়*
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাবলী অনুযায়ী, প্রশাসনিক শাস্তিমূলক বা জনস্বার্থে বদলি হওয়া কোনো কর্মচারীকে তড়িঘড়ি করে পূর্বের অফিসে বা তার চেয়ে উচ্চতর পদে ফিরিয়ে আনা যায় না।এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বির ব্যবহৃত ০১৭১১—৩২৬ মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি “স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পরিদর্শনে আছেন” জানিয়ে ফোনের সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে তাঁর ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে নং এ ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলে, ক্ষুদে বার্তা দেখেও কোন প্রতি উত্তর না দেওয়ায় তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নাই ।
*জনস্বার্থে তদন্তের দাবি*
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একজন ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীকে বেআইনিভাবে ১০ম গ্রেডের পদে বসানোর পেছনে অশুভ কোনো লেনদেন বা প্রভাব রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় এই অবৈধ পদায়নের আদেশ অবিলম্বে বাতিল করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


