মোঃ শাহজালাল, বরগুনা।।
বরগুনার তালতলী উপজেলা বিএনপির রাজনীতিতে মো. শহিদুল হককে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন একের পর এক অভিযোগ, পাল্টা কর্মসূচি, সংঘর্ষ ও দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীদের মারধর, মাছের ঘের থেকে জোরপূর্বক মাছ নিয়ে যাওয়া, জমি ও ঘের দখল, বাজার ইজারার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন।
এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও পাল্টা কর্মসূচি হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষও হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে তালতলী বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কালামের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ও তাঁকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন আহত হন বলে জানা যায়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম মামুন বিএনপি নেতা শহিদুল হকের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ করেন। শহিদুল হক তা অস্বীকার করে অপপ্রচার বলে দাবি করেন।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে সোনাকাটা ইউনিয়ন যুবদলের তৎকালীন সদস্যসচিব সোহাগ খান অভিযোগ করেন, তাঁর বাবা হারুন খানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং টাকা না দেওয়ায় হামলা ও মালামাল লুট করা হয়। শহিদুল হক এ অভিযোগও অস্বীকার করেন।
২০২৫ সালের মার্চে শহিদুল হকের দলের কয়েকজন কর্মী সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তাঁদের অনুপস্থিতির সুযোগে শহিদুল হক ও তাঁর অনুসারীরা মাছের ঘেরে ঢুকে মাছ নিয়ে যান এবং পরে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। ঘের দখল ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও ওঠে। অক্টোবরে নিশানবাড়িয়া এলাকায় জেলে ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা একইভাবে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। শহিদুল হক এসব অভিযোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
তাঁকে ঘিরে বাজার ইজারা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তালতলীর অধিকাংশ হাট-বাজার ইজারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে খাজনা আদায়ের নামে নির্ধারিত এলাকার বাইরেও টাকা আদায়ের চাপ দেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে অনুসারীদের মাধ্যমে হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে শতাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তালতলীর বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ী শহিদুল হক ও তার অনুসারীদের হাতে এক ধরনের জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেকে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না।
অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে বরগুনা জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে শহিদুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এস এম হুমায়ুন হাসান শাহীন স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে নৈতিক স্খলন, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয় বলে জানা যায়। শহিদুল হক অভিযোগগুলো অস্বীকার করে দাবি করেন, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয় ও কোণঠাসা করার জন্য প্রতিপক্ষ পরিকল্পিতভাবে এসব করছে।
শহিদুল হকের রাজনৈতিক অতীত নিয়েও বিএনপির মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনামলে তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন, নৌকার প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং ভোট চেয়েছেন। অন্যদিকে শহিদুল হকের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির দুঃসময়ে তিনি দলের জন্য কাজ করেছেন এবং জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থানও আলোচিত। একসময় তালতলী বাজারে ফল ও কাঁচামালের ব্যবসা করতেন তিনি। পরে বড়বগী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হন এবং বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উপজেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে আসেন। ২০১৭ সালের ইউপি নির্বাচনে তাঁকে বড়বগী ইউনিয়নে বিএনপি-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, এর আগে তিনি জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন এবং ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর তৎকালীন সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদারের সঙ্গে বিএনপিতে যোগ দেন।
তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা রয়েছে। চাচাতো ভাই খলিলুর রহমান জাতীয় পার্টির তালতলী উপজেলা সভাপতি এবং ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন। বড় চাচাতো ভাই কালাম ডুবুরি নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। ছোট ভাই জাহিদুল ইসলাম সোহাগের আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
আরেক ভাই জহিরুল হকের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের একটি অংশ মাদক সেবন করে মাতলামি ও সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
শহিদুল হকের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতা ফরহাদ হোসেন আক্কাস মৃধা এবং তালতলী-আমতলী আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া আনছারুল আলমকে লাঞ্ছিত ও হেনস্তার অভিযোগ নিয়েও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি ২০০৬ সালে সুন্দরী কাঠ চুরির অভিযোগে যৌথ বাহিনীর হাতে আটক ও বিপুল কাঠ উদ্ধারের দাবি এবং সওদাগরপাড়ায় অন্যের জমি দখল করে ঘের করার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
তালতলীর বিএনপির অধিকাংশ নেতৃবৃন্দের দাবি, শহিদুল হককে ঘিরে তৈরি রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পান। তাঁদের অভিযোগ, একজন নেতাকে ঘিরে ধারাবাহিক এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তালতলীতে বিএনপির জনসমর্থন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিপরীতে শহিদুল হকের দাবি, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করতেই প্রতিপক্ষ এসব অভিযোগ করছে।
এ অবস্থায় বিএনপির জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে এখন বড় প্রশ্ন- অভিযোগগুলো কতটা সত্য এবং কতটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি, জেলেদের অভিযোগ, বাজার ইজারা, ঘের ও জমি দখল কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা- প্রতিটি বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা এবং মিথ্যা হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে সংগঠনের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোর পথ।
শহিদুল হকের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে পূর্বের বক্তব্যে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেছেন।
সব মিলিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও দলীয় শোকজকে ঘিরে তালতলী বিএনপিতে শহিদুল হককে কেন্দ্র করে বিরোধ এখন প্রকাশ্য। ব্যক্তির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি এ বিরোধের প্রভাব পড়ছে পুরো উপজেলা বিএনপির ভাবমূর্তি ও জনআস্থায়। ফলে রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
মোঃ শাহজালাল
বরগুনা।।


