এম কে হাসান, জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল গুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্যের গ্রাফ আশঙ্কাজনক ভাবে ঊর্ধ্বমুখী। এই জনপদে এখন প্রধান আতঙ্ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জাহাজপুরা, বাগঘোনা বাজার সংলগ্ন নোয়াখালী পাড়ার কুখ্যাত জিম্মিকারী ও প্রধান অপহরণকারী রিদুয়ান । আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ক্রসফায়ারে নিহত শীর্ষ ডাকাত আব্দুল মালেক প্রকাশ মালেক ডাকাতের ছেলে রিদুয়ানের হাত ধরেই মূলত এলাকায় নতুন করে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এই অপরাধ সাম্রাজ্য।
বাবার অপরাধ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী রিদুয়ান, অনুসন্ধানে জানা যায় বিগত সময়ে বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক মালেক ডাকাত পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর কিছুদিন এলাকা শান্ত ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর অপরাধের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় তার ছেলে রিদুয়ান। বাবার পুরনো নেটওয়ার্ক, অস্ত্র এবং গোপন আস্তানা গুলোকে ব্যবহার করে সে নোয়াখালী পাড়া ও বাহারছড়া অঞ্চলের প্রধান অপহরণকারী হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে।
রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের সমন্বয়ে হাইব্রিড সিন্ডিকেট, স্থানীয় সূত্র ও গোপন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, রিদুয়ানের এই বাহিনীতে প্রায় ২০ থেকে ৪০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এই চক্রটির বড় বৈশিষ্ট্য হলো – এতে স্থানীয় অপরাধীদের পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা অস্ত্রধারী রোহিঙ্গারাও যুক্ত রয়েছে। স্থানীয় অপরাধীরা লোকালয়ের ভেতরের তথ্য, কার আর্থিক অবস্থা কেমন এবং কাকে কখন সহজে ধরা যাবে – সেই রেকি (তথ্য সংগ্রহ) করার কাজ করে। আর রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গহীন পাহাড়ে অপহৃতদের জিম্মি রাখা ও পাহারা দেওয়ার কাজ পরিচালনা করে।
থমকে গেছে বাহারছড়া ইউনিয়নের জনজীবন ও শিক্ষা ব্যবস্থা, এই অপহরণকারী চক্রের নৃশংসতার কারণে বাহারছড়া ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দিনের আলোতেও আতঙ্ক কাজ করছে তাদের মনে । বনের কাছাকাছি বা লোকালয়ের ভেতরের রাস্তায় দিনে-দুপুরেও মানুষ একা চলাচল করতে ভয় পাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে ওৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা মুখ বেঁধে পাহাড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
পাহাড়ের পাদদেশে বা পানের বরজ ও ধানের জমিতে কাজ করতে যাওয়া স্থানীয় কৃষকেরা এখন সবচেয়ে বেশি অপহরণের শিকার হচ্ছেন। ফলে অনেক কৃষক মাঠে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অভিভাবকেরা তাদেরকে একা ঘরের বাইরে পাঠাতে সাহস পাচ্ছেন না। পুরো এলাকায় এক অলিখিত কারফিউর মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যার কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করছে স্থানীয় জনগণ ।
মুক্তিপণের টর্চার সেল হচ্ছে গহীন পাহাড়ে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অপহরণ তথ্য গুলেো বিশ্লেষনে দেখা যায়, অপহৃতদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় জাহাজপুরা ও বাহারছড়ার দুর্গম ও গহীন পাহাড়ি এলাকায়, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় বিছিন্ন। সেখানে জিম্মিদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের অডিও বা ভিডিও রেকর্ড স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দাবি করা হয় লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। টাকা না দিলে লাশ মিলছে পাহাড়ে, আর টাকা দিলে রাতের অন্ধকারে চোখ বেঁধে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে – এমনটাই এখন এই অঞ্চলের বাস্তব চিত্র।
স্থানীয়দের দাবি, যদিও পুলিশ ও র্যাব প্রতিনিয়ত ড্রোন প্রযুক্তি এবং বিশেষ টিম নিয়ে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে, তবুও ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। টেকনাফের এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণ কেবল আশ্বাস নয়, বরং অনতিবিলম্বে রিদুয়ান বাহিনীর সব সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং পাহাড়ি অপরাধীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী যৌথ চিরুনি অভিযানের জোর দাবি জানিয়েছেন।


