সানজানা ইসলাম নশিন,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কয়েক মাস ধরেই শিক্ষার্থীদের মুখে একই প্রশ্ন— “কবে হবে ব্রাকসু নির্বাচন?” প্রশাসন নীরব, গুঞ্জন চলছিল টেবিলের নিচে, করিডোরে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৮ নভেম্বর, মঙ্গলবার রাতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু ঘোষণা স্বস্তি নয়, বরং নতুন করে উত্তেজনার ঢেউ তুলল পুরো ক্যাম্পাসে।শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ভারী হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের বাতাস
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরব ১৮ নভেম্বরের রাতটার যেন অস্বাভাবিক একটা ভার ছিল। প্রশাসনিক ভবনের সামনে টিমটিমে লাইটের নিচে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের মুখগুলোতে জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা আর প্রত্যাখ্যানের প্রতিধ্বনি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
ঠিক রাত সাড়ে ৯টায় যখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. শাহজামান ব্রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করলেন তখন ঘোষণা শোনার পর পরই যেন বদলে গেল বাতাসের রং। প্রশাসনিক ভবনের সামনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের মুখে বিস্ময়, অসন্তোষ আর হতাশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারও চোখে ক্ষোভ, কারও মুখে অবিশ্বাস।
কয়েক মুহূর্ত পরেই সেই হতাশা পরিণত হয় প্রতিবাদে। মুহূর্তেই সেই ঘোষণা ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে, তারপর ফেসবুকের স্ক্রিনে—এবং শেষে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষের বড় ঝড়।
কেউ স্লোগান তুলল, কেউ ফোন বের করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখল— “অযৌক্তিক সময়সূচি মানি না, ব্রাকসুর নামে কৌশল নয়।”শুধু দু’একজন নয়, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট, আবাসিক হল, এমনকি লাইব্রেরির পাশের বেঞ্চেও একই ক্ষোভের সুর। কেউ বলছে—এটা শিক্ষার্থীদের দাবি না শুনে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া; কেউ বলছে—এটার পেছনে “নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ” কাজ করছে।
এ যেন অপেক্ষার শেষে উল্টো ঝড়।
শীতের শুরুতে একটু কুয়াশা পড়া বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা যেন খবরটা শুনেই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে মাথা নাড়ছিল। “২৯ ডিসেম্বর?”—কেউ ফিসফিস করল, কেউ ভিডিও লাইভ চালু করল, আবার কেউ ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “এটা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না।”
প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের জটলা।
নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার পরপরই প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছোট ছোট দল তৈরি হতে থাকে। কেউ পোস্টার হাতে, কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, কেউ লাইভে এসে বলছে—“আমরা এটা মানি না।”অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই জটলা পরিণত হয় প্রতিবাদের চাপে। বাতাসে মিশে গেল ক্ষুব্ধ কণ্ঠ—এক সময়ের শান্ত ক্যাম্পাস রাতের আলোয় যেন জেগে উঠল নতুন উত্তেজনায়।
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে ক্ষোভের অনুরণন।শামসুর রহমান সুমনের কণ্ঠে একধরনের ক্লান্ত ক্ষোভ—“এটা শিক্ষার্থীদের সাথে হঠকারিতা। প্রশাসন আমাদের দাবির কোনো মূল্য দিল না। বন্ধের মধ্যে নির্বাচন তারিখ ঘোষণা—এটা কি শিক্ষার্থী-বান্ধব সিদ্ধান্ত?”তার কথা শেষ হতেই আশপাশের মাথাগুলো সমস্বরে নড়ল।
অন্যদিকে আহমাদুল হক আলবীর চোখেমুখে স্পষ্ট হতাশা।“আমরা বারবার বলেছি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন চাই। ২৯ তারিখ হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিই থাকবে না। নির্বাচন আর উৎসব—দুটোই ম্লান হয়ে যাবে।”তার কণ্ঠে ঘৃণাভরা প্রত্যাখ্যানের ঝাঁঝ যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
মেহেদী হাসান আরও সরাসরি অভিযোগ করলেন—“এই তফসিল শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করেনি। এটা কারও এজেন্ডার বাস্তবায়ন। যারা নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাইছিল তারা সফল হয়েছে। আমরা এটা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।”
ক্যাম্পাসজুড়ে অনিশ্চয়তার হাওয়া।যখন চারদিকে আলো কমছে, ক্যাম্পাসের ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে, তখনই শিক্ষার্থীদের ঘোষণা—আগামীকাল কঠোর আন্দোলন।
হঠাৎ করে রংপুরের ঠান্ডা রাতটা আরও ভারী মনে হচ্ছে।রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের কেউ স্লোগান দিচ্ছে, কেউ ব্যানার বানাচ্ছে, কেউ স্ট্যাটাস লিখছে—এই অস্বস্তিকর শীতের রাতে তাদের চোখেমুখে আগুনের মতো জেদ।
নির্বাচন নয়, যেন আক্ষেপের গল্প।বহু বছরের অপেক্ষার পর ব্রাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার কথা ছিল আনন্দের দিন। কিন্তু সেই ঘোষণাই এখন পরিণত হয়েছে বিভাজনের, হতাশার, ক্ষোভের প্রতীক।কেউ বলছে—এটা নির্বাচনী উৎসবের মৃত্যুঘণ্টা,কেউ বলছে—এটা জরুরি সিদ্ধান্তের অযৌক্তিক বিলম্ব।রাত বারোটার দিকে ফাঁকা করিডোরে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ—“ভোট ২৯ তারিখ হলে ক্যাম্পাস ফাঁকা থাকবে, তাহলে নির্বাচন কাদের জন্য?”কেউ উত্তর দেয় না। কিন্তু নীরবতা যেন প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করে তুলেছে।আর ক্যাম্পাসের বাতাস যেন বলছে—এই নির্বাচনের আগে যুদ্ধ হবে—অধিকার বনাম উদাসীনতার যুদ্ধ।
রাতের আকাশে তারা ওঠার আগেই বেরোবির আকাশ যেন হয়ে উঠেছে অস্থির। শিক্ষার্থীদের দাবি একটাই—ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন।শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও প্রত্যাখ্যানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন কী সিদ্ধান্ত নেয়—তা-ই দেখার অপেক্ষায় সবাই। অনেকেই মনে করছেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রশাসন হয়তো তফসিল পুনর্বিবেচনা করতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন—এবার হয়তো আরও বড় আন্দোলন শুরু হবে।তাদের এই দাবির ঢেউ কি প্রশাসনের কানে পৌঁছাবে?নাকি ২৯ ডিসেম্বরের সেই তারিখই থেকে যাবে ক্যাম্পাসজুড়ে এক অমীমাংসিত ক্ষোভের স্মারক?



