নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলা যোগাযগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের দূর্গমতম জনপদের একটি। একারণে এখানে সরকারি চাকরিজীবীগণ সাধারণত আসতে চায় না। আর কেউ যদি এখানে চাকরি করতে আসতে বাধ্য হয়-ও, তাহলে আসার পর থেকেই বদলির চেষ্টা করতে থাকেন এবং দ্রুতই এক সময় বদলি নিয়ে চলে যায়। এই ধরণের বিষয়গুলো আমরা নিয়মিত’ই দেখে আসছি। কারণ বিভিন্ন প্রয়োজনে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরে আমাদের যেতেই হয়। যতটুকু মনে আছে গত মার্চ মাসের ১৬ তারিখ চৌহালী উপজেলার বর্তমান ইউএনও সিরাজগঞ্জ জেলায় জয়েন করে সেদিন সন্ধ্যায় উপজেলায় এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে যায়। শুনেছি সেদিন রাতেই আনুষ্ঠানিকভাবে ইউএনও’র দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। উপজেলায় নতুন ইউএনও আসলে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সাধারণত দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। মানুষের ভিড়ভাট্টা এড়াতে আমরাও কয়েকজন দেখা করে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গেলাম। ইউএনও সাহেব আমাদের কাছে সার্বিক বিষয়ে সহযোগিতা চাইলেন। কিন্তু তাঁর কথায় খুব একটা আন্তরিকতা আমরা পেলাম না। কারণ এসিল্যান্ডের সাথে দাপ্তরিক কি যেনো একটি বিষয় তিনি কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আমরাও চলে আসলাম। কিছু দিন যাওয়ার পরে তাঁকে আরও কাছে থেকে দেখে বুঝলাম, তিনি আসলে কাজ করার লোক। কথা বলার চেয়ে কাজ করেন বেশি।
তিনি জয়েন করার কিছুদিন পরেই ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস। আমরা দেখলাম ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান ছোট করে হলেও প্রোগ্রামটি ছিলো ছিমছাম গোছানো। স্বাধীনতা দিবসের এই ১টি বিষয় খুব ভালো লেগেছে আর তা হলো- অনুষ্ঠানের দর্শক সারিতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, গণ্যমান্য ব্যক্তি, ছাত্রপ্রতিনিধি, ইভেন গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য আলাদা করে ট্যাগ দিয়ে চেয়ার রেখেছেন। সাধারণত সকল শ্রেণি পেশার জন্য আলাদা করে বসার ব্যবস্থা খুব কম প্রোগ্রামে দেখা যায়। সব সময়’ই দেখে আসছি এই ধরণের অনুষ্ঠানে যারা আগে যায় তারা জায়গা পায় আর যারা সময় মত যায়, তারা অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়ে। চাইলেও এ ধরণের অনুষ্ঠান খুব একটা উপভোগ করা যায় না। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধোনাতে শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে সামনে ইদ থাকায় ইদের জন্য পোলায়ের চাল, সেমাই, চিনি, গুড়দুধ এবং অন্যান্য সামগ্রী পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খুব খুশি হতে দেখেছি।
চৌহালী উপজেলা নকলের জন্য বিখ্যাত ছিলো। নকল করে পাশ করার জন্য অনেকে চৌহালী থেকে পরীক্ষা দিতেন। শুধু যে চৌহালীর শিক্ষার্থীরা নকলের মত অপরাধে জড়িত ছিলো তা নয়, অনেক শিক্ষক পর্যন্ত এই অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। চৌহালীর পরীক্ষার পরিবেশ নকল মুক্ত করতে একদিনেই পরীক্ষায় অপরাধের সাথে যুক্ত ১০ জন শিক্ষককে জেল হাজতে পাঠান তিনি। চৌহালীকে নকল মুক্ত করতে স্রোতের বিপরীতে সাহস নিয়ে এককভাবে লড়ে যাওয়ায় অনেকের বিরুদ্ধেই তাকে যেতে হয়েছে।
সাধারণত অতি মুনফালোভী ঠিকাদারদের কারণে জেলা/উপজেলার উন্নয়নমূলক কাজ ঠিকমত হয় না। এবং দূর্গম জনপদে এই কাজ মনিটরিংয়ের অভাবে এমনিতেও ভালোভাবে সম্পাদন করা হয় না। আর যেটুকুও হয় সেখানে কাজ হয় খুবেই নিম্নমানের। কিন্তু এই উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়েন করার পর থেকে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩টি ইউনয়ন চরের মধ্যে হলেও একাধিকবার পরিদর্শন করেন এবং ঠিকাদারদের কাজগুলোর ত্রুটিবিচ্যুতিগূলো ধরিয়ে দিয়ে তা সংশোধন করার নির্দেশনা দিয়েছে। কাজের ত্রুটিবিচ্যুতিগূলো সংশোধন না করলে এবং কাজের গুণগত মান সঠিক না হলে বিল পেমেন্ট করা হবে না বলে ঠিকাদারদের জানিয়ে দেওয়ার পরে দেখা গেছে প্রায় সকল কাজেই দ্রুত সময়ের মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে। এতে করে অন্যান্য বছরের তুলনায় এই উপজেলায় প্রায় দেড়গুণ কাজ হয়েছে এবং প্রায় সকল কাজের গুণগত মান ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চৌহালী উপজেলা যমুনা নদীর চর এলাকা হওয়ার কারণে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ছিলো এখানকার নিয়মিত ঘটনা। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে ক্ষমতাধরদের বিপক্ষে একাই লড়তে দেখা গেছে তাকে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযানে এমনও দেখা গেছে যে, অপরাধীরা বালু বহনকারী লরি গাড়ি ফেলে পালিয়ে গেছে। তিনি ও তার সহযোগিরা সেই বালূ বহনকারী লরি গাড়ি জব্দ করে নিজে গিয়ে চালিয়ে নিয়ে এসেছেন।
দিনের বেলা দাপ্তরিক কাজের পরেও রাতের বেলা প্রায়’ই দেখা গেছে রাত ১০টা হতে ভোর ৪/৫টা পর্যন্ত নৌ-পুলিশ এবং মৎস্য কর্মকর্তাকে নিয়ে অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল, কারেন্ট জাল এবং অবৈধভাবে ইলেকট্রিক শক দিয়ে যারা নদীতে মাছ ধরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে।
গরীবের ভিজিএফ এবং ভিডাব্লুউডি চাল উদ্ধারে রাতভর অবিশ্বাস্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ একাধিক অভিযান পরিচালনা করতে দেখা গেছে তাঁকে। এবং নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে আদালতের আদেশের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সাথে নিলাম করে সেই অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার ব্যবস্থা করেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে সামনে না হলেও পেছনে পেছনে অনেকের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন।
বাল্যবিবাহ বন্ধেও দেখা গেছে তার মানবিক কিন্তু কঠোর মনোভাব। টাকার জোরে টাঙাইল জেলার একজন প্রবাসী চৌহালী উপজেলার এক গরীব কৃষকের মাদ্রাসার ৯ শ্রেণীতে পড়ুয়া অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিক্ষার্থীকে বাল্যবিবাহ করেন। প্রবাসীকে অর্থদণ্ড দিলেও অপ্রাপ্ত বয়স্ক কনের পিতাকে কন্যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়া কনের পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়ার শর্তে মুচলেকা নিয়ে চেয়ারম্যানের জিম্মায় হস্তান্তর করেন। পুরো উপজেলায় যেখানেই বাল্যবিবাহের খবর পেয়েছেন সেখানেই ছুটে গিয়েছেন তাতক্ষণিকভাবে এবং কঠোর হাতে অন্যায় দমন করেছেন। এভাবে কত-শত বাল্যবিবাহ যে তিনি আটিকে দিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরকে পুনরায় পড়াশোনার করার জন্য স্কুল-মাদ্রাসায় ফিরিয়ে দিয়েছেন তা আমরা চোখের সামনে দেখেছি।
উপজেলায় জয়েনিং এর পর থেকেই তিনি মাদক নিয়ে কাজ করেন। গণমাধ্যম, তরুণ যুবক এবং অভিভাবকদের সাথে মাদক থেকে এই উপজেলাকে মুক্ত রাখার জন্য অনেক মিটিং-এ তিনি কথা বলেছেন এবং এই মাদক থেকে মুক্তি বা উত্তরণের পথ খুঁজেছেন। শিক্ষার্থীদেরকে মাদক, বাল্যবিয়ে, ইভটিজিং থেকে দূরে রাখার জন্য এডিপি থেকে ১০ (দশ) লক্ষ্যাধিক টাকার ক্রীড়া সামগ্রী উপজেলার মাধ্যমিক স্কুল ও প্রাথমিকের।



