জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার বিপুল অর্থ প্রবাহিত হলেও সেই তহবিলের বড় অংশই যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের সংস্থা গুলোর কাছে। কক্সবাজারের স্থানীয় এনজিও গুলোর হাতে যাচ্ছে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ। ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনুমোদিত ৬৩টি প্রকল্পের প্রায় ৫১৯ মিলিয়ন টাকা অর্থায়ন বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট সকাল ১১টায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কোস্ট ফাউন্ডেশন ও কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি ফোরাম (সিসিএনএফ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সাড়াদানের তহবিল কোথায় যাচ্ছে ? – রোহিঙ্গা সাড়াদানের স্থানীয়করণ বিষয়ক গবেষণা ২০২৬ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় ৬৩টি প্রকল্পের বিপরীতে অনুমোদিত প্রায় ৫১৯ মিলিয়ন টাকার মধ্যে আন্তর্জাতিক এনজিও গুলোর ২৮টি প্রকল্পে গেছে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন টাকা। জাতীয় এনজিও গুলোর ৩২টি প্রকল্প পেয়েছে ১৭৬ মিলিয়ন টাকা। বিপরীতে স্থানীয় এনজিও গুলোর মাত্র তিনটি প্রকল্পে অর্থায়ন হয়েছে ১৩ মিলিয়ন টাকা। হিসাব অনুযায়ী, মোট অর্থায়নের ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিও, ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ জাতীয় এনজিও এবং স্থানীয় এনজিও পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
পুলড ফান্ডেও পিছিয়ে স্থানীয় এনজিও:- রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের পুলড ফান্ড ব্যবস্থাপনাতেও স্থানীয় সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়, পুলড ফান্ড থেকে পাওয়া অর্থের মাত্র ২২ শতাংশ পেয়েছে স্থানীয় এনজিও এবং ৭৮ শতাংশ পেয়েছে জাতীয় এনজিও।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (UNOCHA)-এর পুলড ফান্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থের ৯২ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিও। স্থানীয় সংগঠন গুলোকে সরাসরি অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও কক্সবাজারের স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাতে উল্লেখযোগ্য ভাবে অংশ নিতে পারেনি।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয়দের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৫%:- শুধু তহবিল নয়, রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয় কাঠামোতেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ সীমিত। গবেষণায় বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব ৬৮ শতাংশ। বিপরীতে আন্তর্জাতিক, জাতীয় ও স্থানীয় এনজিও—এই তিন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব মিলিয়ে মাত্র ১৫ শতাংশ। ফলে রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের পরিকল্পনা, সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সেক্টর নেতৃত্বেও স্থানীয় এনজিওর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রম সমন্বয়ে থাকা আটটি প্রধান সেক্টরের ছয়টির নেতৃত্ব জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হাতে। একটি সেক্টরে একটি আন্তর্জাতিক এনজিও কো-লিড হিসেবে রয়েছে। কোনো স্থানীয় এনজিও সেক্টর লিড বা কো-লিডের দায়িত্বে নেই।
নতুন রোহিঙ্গা প্রবেশ, বাড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাপ:- গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আগে থেকে কক্সবাজারে অবস্থানরত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার সঙ্গে নতুন এই জনগোষ্ঠী যুক্ত হওয়ায় ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ায় মানবিক সহায়তার বিভিন্ন কার্যক্রমও সীমিত হয়ে আসছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়করণে ১০ দফা সুপারিশ:- সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সাড়াদান কার্যক্রমে স্থানীয়করণ জোরদারে ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—স্থানীয় এনজিওগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব বাড়ানো, বিভিন্ন সেক্টরে স্থানীয় সংস্থার কো-লিডারশিপ চালু, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি তহবিল বৃদ্ধি এবং পুলড ফান্ডে স্থানীয় সংগঠনগুলোর সরাসরি অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীদারদের মধ্যে সমতাভিত্তিক ও পারস্পরিক জবাবদিহিমূলক অংশীদারিত্ব তৈরি, বাংলাদেশভিত্তিক স্থানীয়করণ কৌশল প্রণয়ন এবং স্থানীয় নেতৃত্বাধীন মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণায় স্থানীয় এনজিও ও নেটওয়ার্কগুলোর ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রত্যাবাসন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য টেকসই, ন্যায়সংগত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
মূল প্রশ্ন—আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থ যাচ্ছে কোথায়?
গবেষণায় মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনা হয়েছে—রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিপুল অর্থ সহায়তা প্রবাহিত হলেও সেই অর্থের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সংকটের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে?
গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, ৬৩টি প্রকল্পে প্রায় ৫১৯ মিলিয়ন টাকার মধ্যে স্থানীয় এনজিওগুলোর হাতে গেছে মাত্র ১৩ মিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ সংকটের মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল ও নেতৃত্ব—উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে তাই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে শুধু বাস্তবায়নকারী হিসেবে নয়, বরং তহবিল ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা, সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার করার দাবি জানানো হয়েছে।


