বিশেষ প্রতিবেদক, কক্সবাজার
কক্সবাজার জেলার প্রায় ২৯ লক্ষ স্থানীয় বাসিন্দা, উখিয়া-টেকনাফ উপজেলায় আশ্রিত প্রায় ১৫ লক্ষ রোহিঙ্গা এবং প্রতি বছর বেড়াতে আসা বিপুল সংখ্যক পর্যটকসহ মোট ৪৫ লক্ষ মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের জন দুর্ভোগ লাঘবে এবং মৌলিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে অনন্য এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সংরক্ষিত নারী আসন-২১ (৩২১) এর সংসদ সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না।
কক্সবাজারের মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের অন্যতম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স দীর্ঘদিন ধরে জেলা সদর হাসপাতালে ডায়ালিসিস সেন্টার স্থাপন ও আইসিইউ সেবা পরিধি বাড়ানোর দাবিতে রাজপথে সোচ্চার ছিল। মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের এই প্রাণের দাবিকে জোরালো করে তোলে। তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের এই দীর্ঘদিনের যৌক্তিক ও মানবিক আন্দোলনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও একাত্মতা প্রকাশ করে বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোর তৎপরতা শুরু করেন এমপি শামীম আরা স্বপ্না। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও অবিচল দাবির মুখে অবশেষে কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি সদর হাসপাতালে আগামী দুই মাসের মধ্যে চালু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত কিডনি ডায়ালিসিস সেন্টার এবং বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আইসিইউ সুবিধার পরিধি।
মৃত্যুর মিছিল ও দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান:- দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আধুনিক ডায়ালিসিস সুবিধা না থাকা ও পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) পর্যাপ্ত না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল প্রত্যন্ত গ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা হাজার হাজার জটিল রোগীকে। কিডনি অকার্যকর রোগী, স্ট্রোক কিংবা জরুরি সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম বা ঢাকা ছুটতে হতো। যাতায়াতের এই দীর্ঘ পথ, অ্যাম্বুলেন্সের অতিরিক্ত খরচ এবং চিকিৎসার বিলম্বের কারণে বহু রোগী পথিমধ্যেই করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেন। অন্যদিকে, ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক ভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছিল জেলার অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার।
তরুণদের আন্দোলনে এমপির মানবিক সাড়া ও পদক্ষেপ:-
সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের এই করুণ বাস্তবতা এবং ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স -এর তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন গভীর ভাবে ব্যথিত করে স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্নাকে। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করার অঙ্গীকার থেকে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে উদ্যোগী হয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর নিকট লিখিত আবেদন (ডিও লেটার) পেশ করেন। আবেদনে তিনি জেলা সদরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ডায়ালিসিস সেবা স্থাপন ও আইসিইউ ইউনিটের পরিধি বৃদ্ধির মানবিক ও যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেন।
শুধু চিঠি দিয়েই ক্ষান্ত হননি তিনি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও তিনি কক্সবাজারের এই জরুরি সংকট অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন এবং নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখেন। তাঁর এই আন্তরিক ও অবিচল দাবির প্রেক্ষিতেই সম্প্রতি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রাথমিকভাবে ১০ সেট ডায়ালিসিস যন্ত্রপাতি স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের একাত্মতা:- সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সুশাসন, জনকল্যাণ মূলক উন্নয়ন ও সেবা প্রাপ্তি বিষয়ক এক বিশেষ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য এডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না বলেন, কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ ও ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স – এর তরুণদের মানবিক আকুতি আমাকে গভীর ভাবে স্পর্শ করেছিল। মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমি এই উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমাদের মূল লক্ষ্য কক্সবাজারের সর্বস্তরের জনগণ এবং আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। সরকার স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বরাদ্দ দিচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টি আধুনিক ডায়ালিসিস সেট দিয়ে এই সেবা শুরু হচ্ছে, যেন রোগীরা নিজ জেলায় স্বল্প খরচে ও সহজে এই জটিল চিকিৎসা পান। পর্যায়ক্রমে জেলার অন্যান্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও এই সুবিধা সম্প্রসারিত করা হবে।
স্বাস্থ্য খাতে নতুন যুগের সূচনা:-
জনবান্ধব এই সংসদ সদস্যের এমন দূরদর্শী ও মানবিক পদক্ষেপের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ার্স – এর দীর্ঘদিনের আন্দোলন সফল হওয়ায় কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ও আনন্দের জোয়ার বইছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও জেলাবাসীর মতে, তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের সঠিক দাবি এবং এমপি শামীম আরা স্বপ্নার বলিষ্ঠ ও সাহসী উদ্যোগের এই চমৎকার সমন্বয় কক্সবাজারের স্বাস্থ্য খাতে এক নতুন যুগের সূচনা করল। এই উদ্যোগ জেলার হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি চিকিৎসায় জনদুর্ভোগ কমানোর ক্ষেত্রে একটি চিরস্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে।


