রতন রায় :কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: ১-৯-২০২৬ ইং
“প্রতিবছর এখান জায়গায় খালি ভাঙে, আগের বছর গুলাতো এই জায়গা ভাঙছিলো। জিও ব্যাগ দিয়া নদী আটকা যাবার নয়,এটে ব্লক দেওয়া নাগবে। বড় নেতা আসে তাও কোন কাম হয় না।” এভাবেই তিস্তার ভাঙ্গনের গল্প বলছিলেন বুড়িডরহাট এলাকার বাসিন্দা নূর আলম মিয়া।
অসময়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীতে আবারও তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই উপজেলার বুড়িরহাট এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ক্রসবাঁধের রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেয়। এতে বাঁধটির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৪০ মিটার বাঁধের রাস্তা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা নদীর কাউনিয়া স্টেশনে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় পানির উচ্চতা ছিল ২৮ দশমিক ৭৩ মিটার এবং সকাল ৯টায় ২৮ দশমিক ৭৫ মিটার। ওই স্টেশনে তিস্তার বিপৎসীমা ২৯ দশমিক ৩১ মিটার। অর্থাৎ সকাল ৯টার পরিমাপ অনুযায়ী পানির উচ্চতা বিপৎসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার নিচে ছিল।
এতে বড়দারগা, বুড়িরহাট, রামহরি, চতুরা, কালিরমেলা ও ডাংরারহাট এই ছয় গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ সরাসরি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। হুমকির মুখে রয়েছে বসতভিটা, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং অন্তত পাঁচটি বাজার।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই বুড়িরহাট ক্রসবাঁধের রাস্তার কিছু অংশে হঠাৎ ভাঙন শুরু হয়। পরে রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে। নদীর স্রোত তীব্র থাকায় বাঁধের নিচের অংশের মাটি ও বালু সরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তা নদীর পানি কমা-বাড়ার সঙ্গে একই এলাকায় প্রতিবছরই ভাঙন দেখা দেয়। আগাম সতর্কতার পরও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সালাম মিয়া (৫০) বলেন, “গতকাল আমরা দেখেছি নদীর স্রোত অনেক বেশি ছিল। গত বছরের মতো এবারও ভাঙনের লক্ষণ দেখেছিলাম। আশঙ্কার কথা অনেককে জানিয়েছি। কিন্তু তখন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।”
ক্রসবাঁধের জিও ডাম্পিং ও তীররক্ষা কাজের মান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সালাম ঠিকাদারের মাধ্যমে করা জিও ডাম্পিংয়ের কাজে নানা অসংগতি ছিল। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও নদীর তীররক্ষা ও মেরামতকাজ যথাযথভাবে করা হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় আব্দুর রহিম (৫০) বলেন, “এ বছর রাস্তার মেরামত কাজ হয়নি। উপরে শুধু বস্তা ফেলেছে, নিচে কোনো বস্তা দেয়নি।”
খামার এলাকার বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন (৪০) বলেন, “সকালে এসে দেখি রাস্তা ভেঙে মেছাকার (মিশমিশে/এলোমেলো) হয়ে গেছে। নদীর তীররক্ষার কাজ ভালোভাবে করা হয়নি। এই বাঁধ না থাকলে ফসলি জমি, বাড়িঘর কিছুই থাকবে না।”
মেদনী গ্রামের বাসিন্দা সুলতান আলী (৩০) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যখন নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, তখন এমপি-মন্ত্রী, নেতা সবাই আসে। ভাঙন না থাকলে মেরামতের খবর থাকে না, তখন কাউকে পাওয়া যায় না।”
বুড়িরহাট এলাকার আরেক বাসিন্দা মাইদুল ইসলাম (৩৫) বলেন, “শুকনা মৌসুমে এখানে বালু ছিল। একটা জায়গা অল্প ডেবে গিয়েছিল। তখন কাজ করা হয়নি। এখন পানি বেড়েছে, বালু নেই কীভাবে ভাঙন সামলাবে? সব শেষ হয়ে যাবে আমাদের।”
এছাড়াও স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজারহাট উপজেলার বিভিন্ন নদীভাঙন প্রতিরোধ ও তীররক্ষা কাজ একই ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং মানসম্মত কাজ নিশ্চিত করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কার্যাদেশ, বরাদ্দ, কাজের পরিমাণ, বিল পরিশোধ ও কাজের মানসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এদিকে ক্রসবাঁধের ভাঙন শুধু একটি রাস্তার ক্ষতি নয়; এটি তিস্তার পানি ও স্রোত নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি বাঁধের দুর্বল অংশ চিহ্নিত করে স্থায়ী তীররক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু ভাঙনের পর বস্তা ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ তৈরি করলে প্রতিবছর একই জায়গায় সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, “বুড়িরহাট ক্রসবাঁধে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেওয়ার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত ভাঙনরোধে কাজ করা হবে বলে আশা করছি।”
তবে পানি বাড়ার সঙ্গে নদীর স্রোত ও তীরভাঙন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্রসবাঁধের পুরো অংশের ঝুঁকি নিরূপণ করে স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।


