মো:সিপাউর রহমান, কুলাউড়া, সংবাদদাতা।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি দেশের অন্যতম দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। জমিদার আমলের স্মৃতি বিজড়িত এই প্রসাদটি ইতিহাস ঐতিহ্য, স্থাপত্য শৈলীর অনন্য সমন্বয়ে আজও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। প্রায় ২৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই নবাব বাড়িতে প্রবেশে চোখে পড়ে পুরনো স্থাপত্য সৌন্দর্য, সুবিশাল দিঘী, শানবাঁধানো ঘাট, ইমামবাড়া ও মসজিদ। শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য নির্মিত ইমামবাড়াটি তার চমৎকার নকশা ও কারু কার্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।প্রতিটি স্থাপনাতে নবাবী আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট বিদ্যমান।ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিমপাশা একসময় ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭২ সালে ইংরেজ শাসকদের পক্ষে নওগাঁ কুকিকদের বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কাজী মোহাম্মদ আলী। এই স্বীকৃতি স্বরূপ ইংরেজ সরকার তার ছেলে গাউস আলী খানকে এক হাজার দুইশত হাল বা প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ বিঘা জমি দান করেন। এরপর থেকেই পৃথিমপাশা জমিদারির সূচনা হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় গাউস আলী খান এর নাম আলোচনায় আসে।পরে আর ছেলে আলি আহমদ খানের সময় জমিদারির আর ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তার উত্তরসূরী নবাব আলী আমজাদ খান বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী জমিদার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। নবাব আলী আমজাদের খানের নাম আজ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। ১৮৫৭ সালের তার নামেই সিলেট নগরীর সুরমা নদীর তীরে নির্মিত হয় বিখ্যাত আলী আমজাদের ঘড়ি।যা বর্তমানে সিলেটের অন্যতম ঐতিহ্যের প্রতীক।তিনি শিক্ষা বিস্তার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং সুপেয় পানির জন্য অসংখ্য দীঘি খননের মাধ্যমে সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। নারী শিক্ষা বিস্তারে ১৯০৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মৌলভীবাজার ঐতিহ্যবাহী আলি আমজদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এছাড়াও কুলাউড়ার আলী আমজাদ স্কুল এন্ড কলেজ, রবির বাজার দারুস সুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসা সহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পেছনে নবাব পরিবারের অবদান রয়েছে।পৃথিমপাশা নবাব পরিবারের সদস্যরা শুধু সমাজ সেবায় নয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নবাব আলী হায়দার খান ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা।পরে নবাব আলী সরওয়ার খান, নবাব আলী আব্বাস খানসহ পরিবারের অনেক সদস্য জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ইতিহাসের সাক্ষী এই নবাব বাড়িতে ১৯৫১ সালে ইরানের রাজা রেজা শাহ পাহলভি সফর করেন। এছাড়াও ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুরসহ বহু দেশি বিদেশি অতিথি এই প্রসাদে আগমন করেছেন। বর্তমানে নবাব পরিবারের উত্তরসূরিরা বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। বাড়ির ভেতরে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে জমিদারের ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র ও ঐতিহাসিক নিদর্শন। অন্দরমহল সংরক্ষিত থাকলেও নবাব বাড়ির অধিকাংশ অংশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। পৃথিমপাশা নবাব পরিবারের উত্তরসূরী নবাব আলী ওয়াজেদ খান বাবু এবং নবাব আলী বাকর খান খান হাসনাইন বলেন, আমরা এখনো ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে
বসবাস করছি।


