মোঃতানজিলুল ইসলাম লাইক রাজশাহী , রাজশাহী:
রাজশাহীতে পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরেই এক নারী সার্জেন্ট তার স্বামী, যিনি নিজেও একজন পুলিশ কর্মকর্তা, তার বিরুদ্ধে অমানবিক নির্যাতন, প্রতারণা এবং জোরপূর্বক ভ্রূণ হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। ভুক্তভোগী নারী সার্জেন্ট মোসাঃ সাবিহা আক্তার বর্তমানে আরএমপি রাজশাহীর ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত। তিনি তার স্বামী নিরস্ত্র পুলিশ পরিদর্শক মোঃ মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
বিয়ের আড়ালে প্রতারণা ও গোপন তথ্য
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া সাবিহা আক্তারের সাথে ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি মাহবুব আলমের বিবাহ সম্পন্ন হয়। সাবিহা অভিযোগ করেন, বিবাহের সময় মাহবুব তার পূর্বের বৈবাহিক অবস্থা এবং একটি পালিত কন্যা থাকার বিষয়টি গোপন করেছিলেন। বিয়ের পর সাবিহা জানতে পারেন যে, মাহবুবের আগের স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে দেওয়া তথ্যগুলো ছিল সম্পূর্ণ প্রতারণামূলক।
সাবিহার দাবি, বিয়ের প্রথম রাত থেকেই মাহবুব তার তথাকথিত পালিত কন্যার দোহাই দিয়ে সাবিহাকে স্ত্রীর অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতেন। সাবিহা নিজের বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চালালেও মাহবুব সারাক্ষণ ওই কন্যার পরামর্শে চলতেন এবং অসংখ্য নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কে লিপ্ত হতেন। প্রতিবাদ করলে সাবিহার ওপর চলতো অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সাবিহা জানান, মাহবুবের ল্যাপটপ থেকে তিনি এসব চারিত্রিক স্খলনের অসংখ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন।
অভিযোগের সবচেয়ে লোমহর্ষক অংশটি হলো জোরপূর্বক গর্ভপাত। সাবিহা উল্লেখ করেন, ২০২০ সালে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলে মাহবুব ও তার পালিত কন্যার চাপে তাকে সন্তান নষ্ট করতে বাধ্য করা হয়। রাজি না হওয়ায় অমানুষিক নির্যাতনের একপর্যায়ে ২০২০ সালের ৩০ জুলাই রাজশাহীর লক্ষ্মীপুর এলাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে তার ৪ মাসের ভ্রূণ হত্যা করা হয়।
এছাড়া, মাহবুব নওগাঁয় কর্মরত থাকাকালীন এক টিকটকারের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন বলে সাবিহা জানান। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তাদের আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সাবিহার দাবি, মাহবুব তার অনুমতি ছাড়াই পুনরায় বিবাহ করেছেন অথবা অবৈধভাবে মেলামেশা করছেন।
২০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ ও বর্তমান অবস্থা
কেবল শারীরিক নয়, সাবিহা বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণারও শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সমস্যার কথা বলে মাহবুব বিভিন্ন দফায় সাবিহার এনআরবিসি ব্যাংকের এফডিআর এবং আইএফআইসি ব্যাংকের লোন মিলিয়ে মোট ২০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বর্তমানে তাদের ১৯ মাস বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে, যার প্রতি মাহবুব কোনো দায়িত্ব পালন করেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান যে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত মাহবুব আলম বর্তমানে রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জে বদলির অপেক্ষায় রয়েছেন। বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।
কথা বললে রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, অভিযোগ অনুযায়ী ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও এটি পারিবারিক বিষয় তবুও গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে অভিযোগটি।
সাবিহা আক্তার বলেন: “আমি পুলিশের সার্জেন্ট হিসেবে মানুষের সেবা করলেও নিজের ঘরেই বছরের পর বছর নিগৃহীত হয়েছি। মাহবুব আমার জীবন বিষিয়ে তুলেছেন। আমি এই অমানবিক নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
রাজশাহীর এই ঘটনাটি পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নারী সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। ভুক্তভোগী সাবিহা এখন ন্যায়বিচারের আশায় প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন।


