জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
টেকনাফে মানব পাচার একটি ভয়াবহ ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। সমুদ্র উপকূলে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক পাচারকারী চক্র সক্রিয় থেকে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সীমান্ত পরিস্থিতি ও অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মানব পাচার এবং মাদক পাচার মূলত একই সূত্রে গাঁথা। সম্প্রতি বর্তমান পরিস্থিতিতে সাগর পথে অবৈধ ভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগ জনক ভাবে বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী।
আজ মঙ্গলবার সকালে টেকনাফ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহায়তায় এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের বাস্তবায়নে ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত এক বিশেষ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও এসব কথা বলেন।
কর্মশালায় ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী আরও বলেন, মানব পাচার ও অবৈধ পাচার কমাতে গণ সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। পাচার প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রশাসনিক ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে।
আলোচনায় বক্তারা কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত এলাকা হিসেবে টেকনাফ ও উখিয়ার কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তাঁরা বলেন, সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে দ্রুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা বাড়ানোর জোর দাবি জানানো হয়।
কর্মশালায় বক্তারা সীমান্ত এলাকার এই দুই প্রধান ব্যাধি—মানব পাচার ও মাদক পাচার চিরতরে বন্ধের জন্য এক গুচ্ছ তাৎপর্যপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেন। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও অংশীদারদের মতে, পাচার চক্রের মূল উৎপাটন করতে হলে নিচের খাত গুলোতে প্রশাসনিক নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:-
১. পরিবহন খাতের কঠোর মনিটরিং: মানবপাচার ও মাদক পাচারের পেছনে স্থানীয় ও দূরপাল্লার পরিবহন খাত সরাসরি জড়িত বলে কর্মশালায় অভিযোগ উঠে আসে। টেকনাফে বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস থেকে শুরু করে অটোরিকশা ও স্থানীয় নৌকা—এসব পরিবহন চক্র ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের গোপন স্পটে পৌঁছানো হয়। পরিবহন সেক্টরকে আইনের আওতায় এনে নিয়মিত তল্লাশি ও চালক-সহকারীদের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করতে হবে।
২. মাদক ও পাচার চক্রের যৌথ তদন্ত: যেহেতু মাদক কারবারি ও মানব পাচারকারীরা একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, তাই দুটি অপরাধকে আলাদা ভাবে না দেখে যৌথ তদন্তের আওতায় আনতে হবে। গডফাদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. বিদ্যালয় পর্যায় ও প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব ও অসচেতনতার কারণে সাধারণ মানুষ ও যুব সমাজ এই ফাঁদে বেশি পড়ে। মলকা বানু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইসমাইল বিদ্যালয় পর্যায় থেকে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করতে বিশেষ কার্যক্রম চালুর তাগিদ দেন। এছাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দিন শিক্ষকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
৪. দক্ষতা অর্জন ও নিরাপদ অভিবাসন: কোনো দক্ষতা ছাড়া সমুদ্রপথে ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ গেলে প্রতারণার শিকার হতে হয়। বর্তমানে বিদেশে দক্ষ শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে বৈধ উপায়ে বিদেশ যাওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
মানব পাচারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনালেন ভুক্তভোগী:
কর্মশালায় নিজের নির্মম অভিজ্ঞতার বিবরণ দেন মালয়েশিয়া ফেরত অভিবাসী মো. ইমাম হোসেন। ২০১৯ সালে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়া ইমাম জানান, দালাল চক্র তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের জোর পূর্বক নৌকায় তুলে সমুদ্রের গভীরে নিয়ে যায় এবং অমানুষিক নির্যাতন চালায়। পরে পরিবারের কাছ থেকে জোর পূর্বক মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে তাঁদের পাচার করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় দেশে ফিরে তিনি বর্তমানে একটি পানের দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। নিজের এই দুঃসহ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সবাইকে কোনো প্রলোভনে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ না যাওয়ার অনুরোধ জানান।
ব্র্যাকের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর অজিত নন্দীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটিতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যান্টি ট্রাফিকিং ক্যাম্পেইনের ম্যানেজার শাহনাজ পারভীন এবং সঞ্চালনা করেন কক্সবাজার সেন্টার ম্যানেজার মো. আজিমুল হক।
কর্মশালায় স্থানীয় প্রশাসন, টেকনাফ মডেল থানার প্রতিনিধি, শিক্ষা ও কৃষি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা, ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য, গ্রাম পুলিশ, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবক এবং পাচারের শিকার ভুক্তভোগী পরিবার সমূহ অংশ নেন।
উপস্থিত সুশীল সমাজ ও স্থানীয় প্রতিনিধিরা সতর্ক করে বলেন, এই মুহূর্তে যদি পরিবহন খাত ও মাদক-পাচারকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সীমান্ত অঞ্চলে যুব সমাজ ও স্থানীয় অধিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়বে।



