জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে আনন্দ ভ্রমণ রূপ নিলো এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। সাগরে গোসলে নেমে জোয়ারের প্রবল টান ও সৈকতের বিপজ্জনক ‘গুপ্ত খালে’ তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকা থেকে আসা তিন বন্ধু। এ ঘটনায় আরও দুই বন্ধু নিখোঁজ রয়েছেন, আর মুমূর্ষু অবস্থায় বেঁচে ফিরে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন একজন।
২১ শে অক্টোবর ২০২৬ বুধবার বিকেলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের রামু উপজেলার হিমছড়ি সৈকত পয়েন্টে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় নিহত তিন তরুণ হলেন—সানি, আকাশ ও হারুন। বর্তমানে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন রাকিব নামের আরেক তরুণ। তবে নিখোঁজ থাকা অপর দুই পর্যটকের নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিক ভাবে জানা সম্ভব হয়নি। তারা সবাই চট্টগ্রাম মহানগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এবং একে অপরের নিকটাত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে জানা গেছে।
আনন্দের ভ্রমণ মুহূর্তে ম্লান:-
স্থানীয় ও বিচ কর্মী সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ছয় বন্ধু মিলে সাগরের রূপ উপভোগ করতে সকালে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দুপুরে তারা পৌঁছে হিমছড়ি এলাকার নৈসর্গিক সৈকতে সময় কাটাতে থাকেন। বিকেলের দিকে সাগরের পানির রূপ দেখে তারা সংবরণ করতে না পেরে সবাই একসঙ্গে গোসলে নামেন।
কিন্তু হিমছড়ি সৈকতের যে পয়েন্টে তারা নেমেছিলেন, সেটি মূলত ভাটার সময় তৈরি হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি ‘গুপ্ত খাল’ (Hidden Channel/Trench) এলাকা ছিল। গোসলের একপর্যায়ে উত্তাল ঢেউ ও সৈকতের অতল গহ্বরের টানে ৬ বন্ধুই মুহূর্তের মধ্যে গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে থাকেন।
উদ্ধার অভিযান ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা:-
সাগরে তলিয়ে যাওয়ার সময় তরুণদের বাঁচাও-বাঁচাও চিৎকার শুনে তীরের স্থানীয় পথচারী, ব্যবসায়ী ও বিচ কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্থানীয়দের সহায়তায় সাগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে তিনজনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। একই সময় সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয় রাকিব নামের তরুণকে।
সংকট জনক অবস্থায় রাকিবকে দ্রুত কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, রাকিবের ফুসফুসে অতিরিক্ত পানি প্রবেশ করায় তার অবস্থা বেশ আশঙ্কা জনক এবং তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
নিখোঁজদের সন্ধানে যৌথ উদ্ধার অভিযান:-
ঘটনাস্থলে দুই তরুণ এখনও নিখোঁজ থাকায় সাগরের তীরজুড়ে চলছে উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, বিচ কর্মী ও স্থানীয় ডুবুরি দল যৌথ ভাবে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করছে। তবে সাগরের প্রবল ঢেউ ও সন্ধ্যার অন্ধকারের কারণে উদ্ধার কাজে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজ পর্যটকদের খোঁজে সাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সৈকতে শোকের ছায়া, স্বজনদের কান্নায় ভারী বাতাস:-
দুর্ঘটনার সংবাদ বায়েজিদ এলাকায় পৌঁছানোর পর নিহত ও নিখোঁজদের পরিবারে কান্নার রোল পড়ে যায়। রাতেই স্বজনেরা কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। কক্সবাজার সদর হাসপাতাল চত্বরে নিহত তরুণদের স্বজনদের আহাজারিতে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
গুপ্ত খালের ঝুঁকি ও সচেতনতার অভাব
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের হিমছড়ি ও ইনানী পয়েন্ট গুলোতে বছরের বিভিন্ন সময়ে ভাটার পর বালি সরে গিয়ে ছোট-বড় অনেক ‘গুপ্ত খাল’ তৈরি হয়। উপর থেকে সাগর শান্ত মনে হলেও খালের অংশ গুলোতে থাকে প্রচণ্ড ভেতরের টান বা ‘রিপ কারেন্ট’ (Rip Current)।
স্থানীয় সচেতন মহল ও পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, হিমছড়ির মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও তুলনা মূলক নির্জন পয়েন্ট গুলোতে পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত লাল পতাকা ঝুলানো, বিপদ সংকেত দেওয়া এবং সার্বক্ষণিক বিচ গার্ডের টহল জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। নতুবা এমন অসাবধানতায় বারবার ঝরে যাবে তাজা প্রাণ।


