জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসনিক নীতিমালায় চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি বদলি নীতির তোয়াক্কা না করে এক স্থানে দশকের পর দশক বহাল; প্রেষণ ও পদায়ন অনিয়মে থমকে গেছে পুরো প্রশাসনিক শৃঙ্খলা হাসপাতালে কর্মরত ২৬ জন ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীর দাপ্তরিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বদলি নীতিমালা পুরোপুরি অকার্যকর করে বছরের পর বছর ধরে একদল কর্মচারী পদ আকড়ে বসে আছেন। টানা ১০ বছর থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫ বছর পর্যন্ত একই হাসপাতালে কর্মরত থাকার মাধ্যমে এই কর্মচারীরা অভ্যন্তরীণ এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যা সরাসরি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি বিধি, সরকারি বদলি আইন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন।
চাকরি বিধি ও সরকারি নীতিমালার প্রধান প্রধান লঙ্ঘনসমূহ: সরকারি বদলি নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন (৩ থেকে ৫ বছরের সীমা অতিক্রম), সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী, একজন কর্মচারী এক স্থানে টানা ৩ থেকে ৫ বছরের বেশি অবস্থান করতে পারেন না।
কিন্তু নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে:- মো. ইলিয়াস আহমেদ খান (মেডিকেল টেকনোলজিস্ট-ল্যাব) নামের এই কর্মচারী টানা ৩৫ বছর ধরে (১৯৯১ সাল থেকে) একই স্থানে বহাল তরিয়তে চাকরি জীবন পার করে যাচ্ছেন । তার দেখাদেখি একই পথের পথিক হয়েছেন আবুল কালাম মুস্তাসিন (স্টোর কিপার) তিনি আছেন দীর্ঘ২৫ বছর ধরে (২০০১ সাল থেকে) । মো. মঈন উদ্দিন (হার্বাল অ্যাসিস্ট্যান্ট) পরিচয় প্রদান করেন তত্তাবধায়কের পিএস, এই পরিচয় কে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব বলয়, তিনিও আছেন ২৩ বছর ধরে (২০০৩ সাল থেকে) বহাল । মো. এনায়েত করিম মিঞা ও মোহাম্মদ নুরুল আনোয়ার এই ২ জন ২১ বছর ধরে (২০০৪ সাল থেকে) একই কর্মস্থলে আছেন । অপর্ণা বিশ্বাস, সহায়ক কর্মী (কম্পাউন্ডার) ও মো: এস্তাফিজুর রহমান (অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর) এই ২ জন ২০ বছর ধরে ২০০৫ ও ২০০৬ সাল থেকে বহাল তরিয়তেই আছেন, এর মধ্যে মো: এস্তাফিজুর রহমান দীর্ঘদিন স্বৈরচারের সুফল ভোগি থাকলেও ৫ই আগষ্ট ২০২৪ এরপর বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পারিবারিক লোক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্টা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে । মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ,মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) ১৯ বছর ধরে ২০০৭ সাল থেকে বহাল আছেন নিজের পদ আকড়ে ধরে । মোহাম্মদ নিয়াজুর রহমান, (স্বাস্থ্য শিক্ষাবিদ) ও প্রবীর মিত্র, (স্বাস্থ্য শিক্ষাবিদ) ২ জন ১৬ বছর ধরে (২০১০ সাল থেকে) বহাল তরিয়তে থেকে একই স্থানে বহাল তরিয়তে চাকরি জীবন পার করে যাচ্ছেন । প্রবীর কুমার পাল, মো. সলিম উল্লাহ, আব্দুর রহিম, আবু তাহের মো. মোস্তফা কামাল, রিতন কুমার বড়ুয়া, রাজু কর্মকার ৬ জন ১৫ বছর ধরে ২০১১ সাল থেকে বহাল তরিয়তে একই স্থানে বহাল তরিয়তে চাকরি জীবন পার করে যাচ্ছেন, এরা এতোটাই সৌভাগ্যবান যে সরকারি চাকরি জীবনে বদলী কি এটা তাদের স্পর্শ করতে পারেনি, এই সুযোগ টা কাজে লাগিয়ে যে যার যার সেক্টরে তৈরি করে নিয়েছেন নিজস্ব বলয়, গুছিয়ে নিচ্ছে নিজেদের আখের, গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড় । ষ্টুয়ার্ড মো: নোমান দীর্ঘ ১০ বছরের অধিক কাল ধরে বসে আছেন আপন মহিমায়, তার ক্ষমতা এতই যে, একাই দখল করে আছে খাদ্য, এমসি সহ গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর গুলো তার দখলে রেখেছে ।
প্রেষণ (Deputation) ও পদায়ন সংক্রান্ত অনিয়ম:- হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, মো: মাঈন উদ্দিন (হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট/মালী) এবং আবু তাহের মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল (মেডিকেল টেকনোলজিস্ট – ব্লাড ব্যাংক) ‘Working Deputation’ (প্রেষণে) হিসেবে কর্মরত। প্রেষণের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকার কথা থাকলেও তারা দীর্ঘ সময় ধরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালেই অবস্থান করছেন, যা প্রেষণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
পদের বিপরীতে অস্থায়ী পদায়ন (Against the post) এর দীর্ঘসূত্রতা: প্রবির মিত্র (হেলথ এডুকেটর) এবং মো: সেলিম উল্লাহ (পরিসংখ্যান কর্মকর্তা) দীর্ঘদিন ধরে ‘Against the post’ হিসেবে নিয়োজিত আছেন। নিয়মিত পদায়ন বা পদোন্নতি না দিয়ে বছরের পর বছর পদের বিপরীতে ফেলে রাখার মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়িয়ে রাখা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সেবা মূলক পদে কায়েমি স্বার্থ ও আধিপত্য:- স্টোর কিপার, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ব্লাড ব্যাংক, রেডিয়োলজি, ফার্মাসিস্ট ও হেড অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর পদে বছরের পর বছর একই ব্যক্তি বহাল থাকায় কেনাকাটা, ওষুধ বিতরণ, ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট ও প্রশাসনিক ফাইলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে এর কুফল ও ভুক্তভোগীদের দাবি:- একই হাসপাতালে ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীরা কয়েক দশক ধরে অবস্থান করায় সাধারণ রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্যাথলজি পরীক্ষা, ওষুধ সরবরাহ, এক্স-রে, ব্লাড ব্যাংক ও হিসাব দপ্তরে সিন্ডিকেটের অশুভ প্রভাবে সাধারণ সেবা গ্রহীতা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় সচেতন মহলের জোর দাবি-প্রজাতন্ত্রের চাকরি বিধিমালা বাস্তবায়নে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এই সিন্ডিকেট অবিলম্বে ভেঙে দিতে হবে এবং বছরের পর বছর ধরে বহাল থাকা এসব কর্মচারীদের দ্রুত দেশের অন্যত্র রুটিন বদলি করে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।


