লেখক: সাইফ সোহেল, আইনজীবী ও সংবাদকর্মী
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসকদের কনসালটেশন ফি বা ভিজিট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। একদিকে চিকিৎসকদের দাবি—চিকিৎসা শিক্ষা অত্যন্ত দীর্ঘ, কঠিন ও ব্যয়বহুল; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা একজন চিকিৎসকের সেবার মূল্য কি সবার নাগালের মধ্যে থাকা উচিত নয়?
চিকিৎসকদের উচ্চ আয়ের পক্ষে একটি প্রচলিত যুক্তি হলো, একজন শিক্ষার্থীকে চিকিৎসক হতে দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন করতে হয় এবং কোচিং, বই, আবাসনসহ নানা খাতে পরিবারের বড় ধরনের অর্থ ব্যয় হয়। নিঃসন্দেহে এটি বাস্তবতা। তবে চিকিৎসা পেশা কেবল একটি অর্থনৈতিক পেশা নয়; এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি মানবিক দায়িত্বও বটে। ফলে চিকিৎসাসেবাকে শুধুমাত্র বাজার অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিচার করলে জনকল্যাণ রাষ্ট্রের মূল দর্শনের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হতে পারে।
অনেকেই হয়তো জানেন না, সরকারি মেডিকেল কলেজে একজন চিকিৎসক তৈরির পেছনে রাষ্ট্রেরও বড় ধরনের বিনিয়োগ থাকে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো, হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, গ্রন্থাগার এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা—সবই জনগণের করের অর্থে পরিচালিত হয়। সরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক স্বল্প টিউশন ফিতে পড়াশোনার সুযোগ পান। ফলে একজন চিকিৎসকের পেশাগত প্রস্তুতিতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ বাস্তবতায় একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠে আসে—রাষ্ট্রের এই বিনিয়োগের বিপরীতে চিকিৎসকদের কি সমাজের প্রতি বিশেষ দায়বদ্ধতা রয়েছে? জনস্বার্থভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর উত্তর অনেকাংশেই ইতিবাচক। কারণ রাষ্ট্র যখন একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তুকিপ্রাপ্ত চিকিৎসা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেয়, তখন প্রত্যাশা থাকে তিনি ভবিষ্যতে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবেন।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানেও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নে চিকিৎসক, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রাষ্ট্র—সবাই অংশীদার। চিকিৎসকদের পেশাগত নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তিও হলো মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
তবে এ আলোচনায় একটি বিষয়ও মনে রাখা প্রয়োজন—সব চিকিৎসক একই ধরনের আয় করেন না, এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নির্ধারণে চিকিৎসকদের পাশাপাশি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধব্যবস্থা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সমস্যার সমাধান এককভাবে চিকিৎসকদের ওপর দায় চাপিয়ে নয়; বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের উচিত সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসকদের ন্যায্য কর্মপরিবেশ ও সম্মানজনক পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, চিকিৎসকদেরও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সম্মান দেখিয়ে মানবিকতা, পেশাগত নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসা পেশা যেমন সম্মানের, তেমনি দায়িত্বেরও। একজন চিকিৎসকের পেছনে যেমন তাঁর নিজের ও পরিবারের ত্যাগ রয়েছে, তেমনি রয়েছে রাষ্ট্র ও জনগণেরও বিনিয়োগ। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও আস্থাশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।


