মো. কামরুল হাসান, কক্সবাজার
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে তিন দিনের পর্যটন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে মেলা, সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি, লোকজ সংগীত, ফ্যাশন শো, ব্যান্ড শো, সুফি ও কাওয়ালি গান সহ নানা আয়োজন রয়েছে। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এই মেলার প্রতিপাদ্য – ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমতায় আগামীর পর্যটন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, তিন দিনের এমন আয়োজন দিয়ে কি কক্সবাজারের পর্যটন রাজধানীর পরিচয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
কক্সবাজারে পর্যটক আসেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্য হিসেবে যে ধরনের নিরাপত্তা, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা, বিনোদন, জরুরি চিকিৎসা, পরিবেশ সুরক্ষা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে এখনো রয়েছে নানা ঘাটতি। ফলে পর্যটন প্রচারের আয়োজনের পাশাপাশি কক্সবাজারকে দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বমানের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়েই এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বন, দ্বীপ, সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবার—সব মিলিয়ে এখানে পর্যটনের বহুমাত্রিক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু সৈকত নির্ভর পর্যটন থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
সৈকতের বাইরে পর্যটন পণ্য কোথায়
আন্তর্জাতিক পর্যটক সাধারণত একটি গন্তব্যে শুধু একটি আকর্ষণ দেখতে যান না। সমুদ্রের পাশাপাশি তাঁরা চান প্রকৃতি, সংস্কৃতি, খাবার, বিনোদন, কেনাকাটা ও অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা। কক্সবাজারেও এ ধরনের সমন্বিত পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারকে Beach & Leisure, Nature & Eco-tourism, Culture & Heritage, Adventure & Marine Tourism, Family Entertainment, Food & Shopping এবং Convention & Business Tourism – এমন কয়েকটি পর্যটন ক্লাস্টারে ভাগ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে একটি সমন্বিত পর্যটন ও বিনোদন অঞ্চল গড়ে তুলে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, ওপেন-এয়ার থিয়েটার, শিশু ও পরিবারের বিনোদন কেন্দ্র, অ্যাকোয়ারিয়াম, স্থানীয় খাবার ও হস্ত শিল্পের বাজার গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে পর্যটকের অবস্থানকাল বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসার সুযোগও বাড়তে পারে।
বিমান বন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে সৈকত
পর্যটন নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগাযোগ। কক্সবাজার বিমান বন্দর ও রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় পর্যটকের যাতায়াতের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু বিমান বন্দর বা রেল স্টেশন থেকে হোটেল, সৈকত ও অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রে সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।
পর্যটন বাস, বিমান বন্দর-হোটেল-বিচ শাটল, নির্ধারিত ভাড়ার ট্যাক্সি, স্মার্ট পার্কিং, Park-and-Ride ব্যবস্থা, প্রশস্ত ফুটপাত ও সাইকেল লেন চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজন সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
কারণ পর্যটনের অভিজ্ঞতা শুরু হয় গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই। যানজট, অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও ভাড়ার অনিশ্চয়তা থাকলে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা কঠিন।
সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির পর কী হবে
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে মেলার অন্যতম কর্মসূচি সৈকত পরিচ্ছন্নতা। কিন্তু এক দিনের পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের সৈকত ব্যবস্থাপনা। কক্সবাজার সৈকতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, চেঞ্জিং রুম, নিরাপদ গোসলের নির্ধারিত এলাকা, নারী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য নিরাপদ সুবিধা, ছায়াযুক্ত বসার স্থান, পর্যটক তথ্য কেন্দ্র, সমুদ্রের অবস্থা জানানোর ডিজিটাল ডিসপ্লে, লাইফ গার্ড টাওয়ার, জরুরি উদ্ধার কেন্দ্র, নিরাপদ আলোকসজ্জা ও প্রতিবন্ধী বান্ধব প্রবেশ ব্যবস্থা।
এসব সেবা বিভিন্ন সংস্থার বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের পরিবর্তে একটি সমন্বিত Beach Safety and Management Unit-এর অধীনে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পর্যটন উন্নয়ন, নাকি পরিবেশের ওপর চাপ
কক্সবাজারের পর্যটনের প্রধান সম্পদই প্রকৃতি। তাই পরিবেশের ক্ষতি করে পর্যটন অবকাঠামো বাড়ানো হলে দীর্ঘমেয়াদে তার ফল উল্টো হতে পারে। বর্জ্য পৃথকী করণ, পুনর্ব্যবহার, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্রের পানির নিয়মিত মান পরীক্ষা জরুরি। নির্বাচিত সৈকত এলাকায় আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান অর্জনের লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে।
কক্সবাজারকে শুধু হোটেল ও রিসোর্টের শহর না করে একটি টেকসই পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রয়োজন।
রাতের কক্সবাজারকে কাজে লাগানো যায়
দিনের সৈকতের বাইরে রাতের পর্যটনেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরিবার বান্ধব Night Tourism Zone গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় খাবারের বাজার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত, হস্ত শিল্পের বাজার, পারফর্মিং আর্টস ও নিরাপদ ওয়াকওয়ে গড়ে উঠলে রাতের অর্থনীতিও সক্রিয় হতে পারে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, প্রদর্শনী, করপোরেট অনুষ্ঠান ও বাণিজ্য মেলার জন্য Convention and Exhibition Centre গড়ে তুললে পর্যটন মৌসুমের বাইরেও কক্সবাজারে মানুষের সমাগম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও চিকিৎসায় গুরুত্ব কতটা
আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যের জন্য জরুরি চিকিৎসা ও নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জরুরি চিকিৎসা কেন্দ্র, অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত লাইফ গার্ড, সমুদ্র উদ্ধার ব্যবস্থা এবং ফায়ার ও রেসকিউ সার্ভিসের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। পর্যটকদের জন্য Tourist Assistance Booth এবং একটি একক হটলাইন চালু করা যেতে পারে। হোটেল, হাসপাতাল, পরিবহন, পর্যটন স্পট, আবহাওয়া, সমুদ্রের অবস্থা ও জরুরি সহায়তার তথ্য একটি Cox’s Bazar Tourism Super App-এ যুক্ত করা সম্ভব।
স্থানীয় মানুষ কতটা অংশীদার
পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ানো না গেলে পর্যটনের সুফল সীমিত থাকবে। জেলে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পী, রেস্টুরেন্ট কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, পর্যটন গাইড, তরুণ ও নারীদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তাঁদের জন্য Hospitality, Language, Food Safety, Customer Service, First Aid, Digital Marketing ও Marine Tourism বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে রামু, ইনানী, হিমছড়ি, মহেশখালী, সোনাদিয়া, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনকে একটি সমন্বিত Tourism Circuit-এর আওতায় আনা গেলে কক্সবাজারের বাইরে পুরো অঞ্চলে পর্যটনের সুফল ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়ন কতটা
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান তৈরির উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে কক্সবাজারে পরিকল্পনা ও প্রকল্পের অভাব অতীতে ছিল না। বড় প্রশ্ন ছিল বাস্তবায়ন।
তাই নতুন পরিকল্পনায় শুধু প্রকল্পের তালিকা থাকলে হবে না। কোন কাজ কখন হবে, অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, কোন সংস্থা দায়িত্ব নেবে এবং বাস্তবায়ন কতটা এগিয়ে গেল – এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কাঠামো থাকা প্রয়োজন। সরকারি সংস্থা গুলোর সমন্বয়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা জরুরি।
তিন দিনের মেলা শেষ হওয়ার পরই আসল পরীক্ষা পর্যটন মেলা কক্সবাজারকে প্রচারের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যের স্বীকৃতি কোনো এককালীন আয়োজনের ফল নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং পর্যটক সেবার মান উন্নয়ন।
কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে। পর্যটকও আসছেন। এখন প্রয়োজন সেই সম্পদের সঙ্গে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা। তিন দিনের মেলা মানুষকে কক্সবাজারের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে—নিরাপদ সৈকত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সহজ যোগাযোগ, মানসম্মত সেবা, বৈচিত্র্যময় পর্যটন পণ্য এবং পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন।
সুতরাং এবারের পর্যটন মেলা শেষ হওয়ার পর প্রশ্নটি থেকেই যাবে – উৎসব শেষ হলে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী পরিবর্তন কতটা আসে? সেই পরিবর্তনই নির্ধারণ করবে ‘পর্যটন রাজধানী’ কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং কতটা বাস্তব রূপ পাবে।


