উমংনু মারমা, বান্দরবান।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের তীর্থভূমি বান্দরবান। পাহাড়, ঝরনা, নদী, মেঘ আর সবুজের সমারোহ দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সারা বছরই ছুটে আসেন পর্যটকেরা। জেলার সাত উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় ৪৬টি পর্যটন স্পটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটননির্ভর একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
পর্যটকের আনাগোনায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, গাইড ও আবাসন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঈদসহ বিভিন্ন ছুটিতে বান্দরবানের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো আগাম বুকিংয়ে পূর্ণ হয়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
তবে পর্যটনের এই বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আরেকটি প্রশ্ন—প্রকৃতিকে দেখাতে গিয়ে সেই প্রকৃতিই কি ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
‘ইকো’ নামেই কি পরিবেশবান্ধব?
পর্যটন কেন্দ্রগুলোর আশপাশে গত কয়েক বছরে বেড়েছে হোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও বিভিন্ন ধরনের বিনোদনকেন্দ্র। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর নামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘ইকো’ শব্দটি। কিন্তু কোনো স্থাপনার নামের সঙ্গে ‘ইকো’ শব্দটি থাকলেই সেটি পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না।
পরিবেশবান্ধব পর্যটন বলতে এমন ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ, গাছপালা অপসারণ, ঝিরি-ঝরনার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা কিংবা পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ছাড়া পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে তার প্রভাব পড়ে পুরো পাহাড়ি প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, অপরিকল্পিত পর্যটন স্থাপনার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে এবং বর্জ্য পাহাড়, ঝিরি-ঝরনা ও নদীতে গিয়ে মেশার আশঙ্কা রয়েছে। একই প্রতিবেদনে লামা উপজেলায় অনুমোদনবিহীন পর্যটন স্থাপনার বিস্তারের কথাও উঠে আসে।
পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে স্থাপনা।
বান্দরবানের পর্যটনের প্রধান আকর্ষণই হলো পাহাড় ও বন। অথচ পর্যটকদের জন্য নতুন নতুন স্পট তৈরি এবং আবাসন নির্মাণের ক্ষেত্রে পাহাড়ের ঢাল ও প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড় কেটে সমতল জায়গা তৈরি করলে শুধু একটি পাহাড়ের আকৃতি বদলায় না; এর সঙ্গে মাটির স্থিতিশীলতা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থলও পরিবর্তিত হয়। বর্ষায় অতিবৃষ্টির সময় এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
২০২৬ সালের বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের ঝুঁকির কারণে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধও করেছিল জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পাহাড়ি সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছিল।
বর্জ্য কোথায় যাবে?
পর্যটন বাড়লে বাড়ে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, পানীয়র বোতলসহ নানা ধরনের বর্জ্য। পাহাড়ের চূড়া কিংবা ঝরনার পাশে স্থাপিত কোনো রিসোর্টে পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে সেই বর্জ্য শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে—এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বান্দরবান শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র না থাকায় বিভিন্ন উৎসের বর্জ্য পাহাড়ের খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে এবং বৃষ্টির পানির সঙ্গে তা সাঙ্গু নদীতে গিয়ে পড়ছে।
যদি শহরাঞ্চলের বর্জ্যই এমন সমস্যার সৃষ্টি করে, তাহলে দুর্গম পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ছোট-বড় অসংখ্য আবাসন ও খাবারের দোকান থেকে প্রতিদিন উৎপন্ন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা কতটা হচ্ছে—সেটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে পর্যটনের ইতিবাচক প্রভাবও আছে
তবে পর্যটনকে শুধু পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিকল্পিত ও টেকসই পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
হোটেল-রিসোর্টে কর্মসংস্থান, স্থানীয় পরিবহন, পর্যটক গাইড, রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় কৃষিপণ্য ও হস্তশিল্প বিক্রি—সব ক্ষেত্রেই পর্যটকের উপস্থিতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায়।
২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে বান্দরবানে বিপুল পর্যটক সমাগম এবং হোটেল-রিসোর্ট আগাম বুকিং হয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, পর্যটন ইতোমধ্যে স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হলো—এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল কতটা স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং এর পরিবেশগত মূল্য কতটা দিতে হচ্ছে?
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় সংস্কৃতিও?
বান্দরবানের পর্যটনের আরেকটি বড় সম্পদ হলো এখানকার বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। পর্যটনের নামে যদি স্থানীয় সংস্কৃতিকে কেবল প্রদর্শনের উপকরণে পরিণত করা হয়, অথচ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত, অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে পর্যটনের সুফলের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চাপও তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় মানুষের ভূমি, কৃষি, বন ও পানির সঙ্গে যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, পর্যটন অবকাঠামোর বিস্তার সেই সম্পর্ককে পরিবর্তন করতে পারে। তাই নতুন কোনো পর্যটন প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্থানীয় মানুষের মতামত ও সম্ভাব্য সামাজিক-পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
‘পর্যটন বনাম পরিবেশ’ নয়, প্রয়োজন টেকসই পর্যটন
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বার্তাগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃতি, ভূমি, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে উন্নয়নের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের বার্তায়ও দূষণ, ভূমির অবক্ষয়, প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
বান্দরবানের জন্য তাই প্রয়োজন পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন পরিচালনা করা।
নতুন হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ স্থাপনের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূমির প্রকৃতি, পাহাড়ের ঢাল, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা যেতে পারে—কোথায় কতটি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, কোনটির অনুমোদন আছে, কোনটির পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে এবং কোনগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম মানছে।
কারণ প্রকৃতিকে কেন্দ্র করেই যদি বান্দরবানের পর্যটন, তাহলে সেই প্রকৃতিই যদি নষ্ট হয়ে যায়, ভবিষ্যতে পর্যটকের আকর্ষণটাও হারিয়ে যেতে পারে।
পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে মানুষ বান্দরবানে আসে। সেই সৌন্দর্যের জায়গায় যদি একদিন শুধু কংক্রিটের স্থাপনা, প্লাস্টিকের বর্জ্য আর ক্ষতবিক্ষত পাহাড় দেখা যায়, তাহলে পর্যটনের যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আজ তৈরি হয়েছে, সেটিও দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে পড়বে।
বান্দরবানের পাহাড় তাই শুধু পর্যটনের সম্পদ নয়—এটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকারও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে প্রশ্নটি তাই একটাই—
প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে পর্যটন, নাকি পর্যটনের নামে প্রকৃতিকে হারানো?


