বিশেষ প্রতিবেদক
কক্সবাজার
সরকারি চাকরির তিন বছর পরপর বদলির স্পষ্ট নীতিমালা থাকলেও কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে তা পুরোপুরি উপেক্ষিত। বছরের পর বছর, এমনকি সর্বোচ্চ ৩৫ বছর ধরে একই পদে বহাল থেকে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সম্প্রতি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি প্রশাসনিক ও জনমনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে জোর দাবি জানিয়েছে সুশীল সমাজ ও সেবাগ্রহীতারা। অন্যদিকে, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণীর ৮১.৬% কর্মকর্তা এবং ৩য় শ্রেণীর ৭৩.১% কর্মী ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে বহাল আছেন। ল্যাব টেকনোলজিস্ট মোঃ ইলিয়াছ আহমেদ খান ৩৫ বছর ১ মাস ধরে এবং স্টোর কিপার আবুল কালাম মোস্তাসিন ২৫ বছর ৮ মাস ধরে একই আসনে আসীন থেকে হাসপাতালটিতে নিজস্ব প্রভাব বলয় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নার্সিং সেবা, হিসাব-নিকাশ, কেনাকাটা ও ইমার্জেন্সি চিকিৎসায় বছরের পর বছর ধরে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকা এই সিন্ডিকেট ও অনিয়ম নিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য নিচে তুলে ধরা হলো:
হাসপাতাল প্রশাসনের বক্তব্য:-
দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকা ও বদলি না হওয়া প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে
বিগত ৩০-১২-২০০৩ সালে যোগদান করেন, দীর্ঘ ২২ বছর ৯ মাস এই হাসপাতালে কর্মরত থাকা ডা: আশুতোষ ধর বলেন, আমি প্রজেক্টে যোগদান করেছিলাম।এখনও ফুল রেভিনিউ হয়নি তাই। কিন্তু কখন কোথায় কোন প্রজেক্টে জয়েন করেছেন এবং বর্তমানে কোন প্রজেক্টে আছেন তার কোন সদুত্তর তিনি দেন নাই ।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ০১-০৯-২০১২ সালে যোগদান করে দীর্ঘ ১৪ বছর কর্মরত থাকা জুনিয়র হেলথ এডুকেশন অফিসার মোহাম্মদ হোসাইন জানান, আমি ০১/০৯/২০১২ খ্রিঃ তারিখে কক্সবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে যোগদান করে অদ্যাবদি পর্যন্ত কর্মরত আছি। আমার কর্মরত পদটি বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সৃজিত/বিদ্যমান নাই। তাছাড়া যে সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পদ সৃজিত আছে সেই সকল প্রতিষ্ঠানে পদ শুন্য না থাকায় বদলীর সুযোগ পাচ্ছি না । কিন্তু বাস্তব চিত্র হচ্ছে ভিন্ন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, জুনিয়র হেলথ এডুকেশন অফিসার পদটি মূলত প্রতিটি জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে ১টি করে সৃজিত থাকে, এটি সরাসরি জেলা সদর হাসপাতালের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর পদ নয়। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে এই পদটি সৃজিত রয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য স্বার্থের টানে জেলা সদর হাসপাতাল ছাড়া যাচ্ছে না ।
এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য আরো কয়েক জনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের সাড়া না পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নাই ।
এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানান, অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানের ঘাটতি থাকায় প্রশাসনিক বিশেষ বিবেচনায় পদে বহাল রাখতে হয়। তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।
এই বিষয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার(প্রশাসন) ডা: সান্তনু ঘোষ’র সাথে বিষয়টি নিয়ে উনার বক্তব্য নেওয়ার জন্য উনার ব্যবহৃত মোবাইল নং ০১৭৫০—৮৯০ নং এ প্রতিবেদকরে পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে চেষ্টা করার পরও কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নাই।
এই বিষয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের তত্তাবধায়ক ডা: মং টিন ঞো’র সাথে বিষয়টি নিয়ে উনার বক্তব্য নেওয়ার জন্য উনার ব্যবহৃত মোবাইল নং ০১৭৪৯—৬৩৯ নং এ প্রতিবেদকরে পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বারবার চেষ্টা করার পরও কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নাই।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের চট্রগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক ডা: শেখ ফজলে রাব্বি’র সাথে বিষয়টি নিয়ে উনার বক্তব্য নেওয়ার জন্য উনার ব্যবহৃত মোবাইল নং ০১৭১১—৩২৬ নং এ প্রতিবেদকরে পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে বারবার চেষ্টা করার পরও কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নাই।
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (পরিচালক-প্রশাসন) প্রফেসর ডা: জালাল উদ্দিন মাহামুদ রুমি’র সাথে বিষয়টি নিয়ে উনার বক্তব্য নেওয়ার জন্য উনার ব্যবহৃত মোবাইল নং ০১৭০১—০০৩ নং এ প্রতিবেদকরে পরিচয় দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে চেষ্টা করার পরও কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নাই।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) এক প্রতিনিধি বলেন, “ল্যাব, কেনাকাটা এবং জরুরি বিভাগে দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণের কারণে সেখানে জবাবদিহিতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদী এই স্থবিরতা সাধারণ রোগীদের গুণগত সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে। জরুরি ভিত্তিতে এই সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন জনবল পদায়ন না করলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।
প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করেই এই ভয়াবহ স্থবিরতার প্রমাণ মেলে। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দ্রুত পদক্ষেপ এবং প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযানের দিকেই তাকিয়ে আছে কক্সবাজার জেলার সর্বস্তরের মানুষ।


