জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক ও স্থানীয় অধিবাসীদের নিত্যদিনের ভোগান্তির অপর নাম এখন ইজি বাইক বা ‘টমটম’। জেলা শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে এখন চরম বিশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক জট। কোনো প্রকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা ছাড়াই তিন ধরনের ভিন্ন ভিন্ন লাইসেন্স নম্বর প্লেট ব্যবহার করে বেপরোয়া গতিতে ছুটছে হাজার হাজার টমটম। একই সাথে চালকদের বড় অংশ ক্যাম্পত্যাগী রোহিঙ্গা ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর হওয়ায় পুরো শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিসহ চুরি, ছিনতাই ও মাদক পাচারের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে।
বৈধ ৩ হাজার, ‘লুটকৃত’ হাজারও লাইসেন্স নবায়নের অভিযোগ
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, পৌর এলাকায় চলাচলের জন্য অনুমোদিত বৈধ টমটমের সংখ্যা মাত্র ৩,০০০টি। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন পৌরসভা পরিষদ থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অন্তত ১,০০০টি অতিরিক্ত লাইসেন্স প্লেট লুট করা হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরবর্তীতে তৎকালীন পৌর প্রশাসক রুবাইদা আফরোজ এক অফিসিয়াল আদেশের মাধ্যমে এসব লুটকৃত লাইসেন্সকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বর্তমান পৌর কর্তৃপক্ষ সেই লুটকৃত লাইসেন্সধারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি; বরং আইন ও প্রশাসনিক আদেশকে তোয়াক্কা না করে সেই ১,০০০ অবৈধ লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ফলে জালিয়াতি করে তৈরি এসব যান বাহন নতুন করে আইনি বৈধতা পেয়ে পুরো শহর দখল করে নিয়েছে।
৮০ শতাংশ চালকই ক্যাম্পত্যাগী রোহিঙ্গা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের তথ্য মতে, পৌরসভায় চলাচলকারী ইজি বাইক গুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ চালকই উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর। কোনো প্রকার ড্রাইভিং লাইসেন্স, ট্রাফিক আইন বা স্থানীয় পথঘাট সম্পর্কে ধারণা না থাকা সত্ত্বেও কেবল কম মজুরিতে পাওয়ার কারণে অসাধু মালিকরা এদের হাতে যানবাহন তুলে দিচ্ছেন। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা চালকদের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে একদিকে যেমন পর্যটকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে চুরি, ছিনতাই ও ইয়াবা পাচারের মতো অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড দিন দিন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।
তিন ধরনের লাইসেন্স প্লেটের বিভ্রান্তি
সরেজমিনে শহরের সড়কগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, একই পৌরসভায় অন্তত তিন ধরনের নম্বর প্লেট ঝুলিয়ে অবাধে গাড়ি চালানো হচ্ছে:
১. পুরানো মেয়াদী টিনের প্লেট: মেয়াদী পুরোনো আমলের টিনের সাধারণ নম্বর প্লেট ।
২. সবুজ-সাদা লাইসেন্স: সম্প্রতি ইস্যুকৃত বিস্তারিত মালিকানা ও তথ্যাদি সংবলিত সবুজ-সাদা রঙের প্লেট।
৩. ডিজিটাল কিউআর কোড প্লেট: কিউআর কোড ও বেগুনি বর্ডার সংবলিত নতুন নম্বর প্লেট ।
এ একাধিক রূপ ও জালিয়াতির কারণে ট্রাফিক পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সড়ক থেকে আসল ও নকল বা বৈধ-অবৈধ টমটম সনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“ডাম্পিং স্টেশন নেই, নেতাদের সুপারিশে আমরা উভয় সংকটে” — পুলিশ
টমটম, মিশুক ও অটোরিক্সার অবাধ চলাচল ও ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে কথা বললে কক্সবাজার জেলা ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেবদূত মজুমদার জানান, আমাদের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো উপযুক্ত ডাম্পিং স্টেশন না থাকা। অবৈধ যানবাহন জব্দ করে যেখানে রাখা হবে, সেই জায়গার অভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, যখনই আমরা সড়কে কঠোর অভিযান চালাতে যাই, তখনই বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এসব অবৈধ যানের সুপারিশ নিয়ে হাজির হন। ফলে আমাদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় উভয় সংকটে পড়তে হয়।
বিপন্ন পর্যটন শিল্প: সচেতন পৌরবাসীর ৩ দাবি
দেশি-বিদেশি লাখ লাখ পর্যটকের অন্যতম আকর্ষণীয় এই শহরের সুনাম রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও পৌরসভার যৌথ জিরো-টলারেন্স ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা অবিলম্বে ৩টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছেন:
১. অবৈধ ঘোষিত লাইসেন্স জব্দ: তৎকালীন পৌর প্রশাসকের আদেশে অবৈধ ঘোষিত ১,০০০ লাইসেন্স বাতিলসহ অনুমোদনহীন সব টমটম, মিশুক ও অটোরিক্সা বাজেয়াপ্ত করা এবং অবৈধ নবায়ন প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু তদন্ত করা।
২. রোহিঙ্গা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মুক্তকরণ: বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ও এনআইডি (NID) যাচাইয়ের মাধ্যমে ক্যাম্পত্যাগী রোহিঙ্গা এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
৩. একক সেন্ট্রাল ডাটাবেজ ও ডিজিটালাইজেশন: ভুয়া ও জাল প্লেট বন্ধে কিউআর কোডযুক্ত একটিমাত্র সমন্বিত ডিজিটাল লাইসেন্স চালু করা এবং নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।


