সেনবাগ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতাল ও বাড়িতে চিকিৎসাধীন থাকার পরও স্থানীয় বিএনপির কোনো নেতাকর্মী খোঁজ নিতে আসেননি—এমন অভিযোগ ও আক্ষেপ করেছেন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার ৬ নম্বর কাবিলপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবদুল মোতালেব।
তবে দীর্ঘ অসুস্থতা ও শারীরিক কষ্টের মধ্যেও নিজের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে যাননি বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর পায়ে অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে ভুল করেননি তিনি।
মোঃ আবদুল মোতালেব বলেন, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনপুকুরিয়া কর্মস্থলে যাওয়ার পথে উত্তর সাহাপুরের খালেকের দোকানের সামনে তিনি দুর্ঘটনার শিকার হন।
তাঁর অভিযোগ, সেনবাগমুখী একটি ট্রাক ও একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মধ্যে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতার সময় একটি গাড়ি রং সাইডে গিয়ে তাঁকে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার পর গাড়িটি ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় বলে তিনি দাবি করেন।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে তাঁকে সেনবাগ সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান—পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মোতালেব জানান, সেখানে তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং প্রায় ২২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পরও বিভিন্ন চিকিৎসাজনিত কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় এক মাস ১৫ দিন ঢাকায় চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফেরার পরও আরও প্রায় এক মাস ১৫ দিন অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় থাকতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘একজনও খোঁজ নিতে আসেননি’
দীর্ঘ চিকিৎসাজীবনের সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হিসেবে মোতালেব উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের অনুপস্থিতিকে।
তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত থাকলেও দুর্ঘটনার পর সেনবাগ উপজেলা বিএনপি কিংবা তাঁর নিজ ইউনিয়ন কাবিলপুর ইউনিয়নের কোনো নেতা তাঁর খোঁজ নিতে আসেননি।
মোতালেবের ভাষ্য,
“নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে আমার প্রাণপ্রিয় সংগঠন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির একজন নেতাকর্মীও আমার খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। বাড়িতে অসুস্থ অবস্থায় এতদিন থাকার পরও কোনো নেতা আমাকে দেখতে আসেননি।”
তাঁর এই বক্তব্য স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগাযোগ ও সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি সাধারণত শুধু বড় সভা-সমাবেশ কিংবা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অসুস্থতা, দুর্ঘটনা ও ব্যক্তিগত দুর্দিনে কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোও দলীয় সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। একজন দীর্ঘদিনের কর্মী অসুস্থ থাকার পরও যদি নিজেকে উপেক্ষিত মনে করেন, তাহলে তা তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে মোতালেবের অভিযোগের বিষয়ে সেনবাগ উপজেলা ৬ নম্বর কাবিলপুর ইউনিয়ন ২ নং ওয়ার্ডের নাম্বার রবিউল হক মানিক এর সাথে যোগাযোগ করা হলে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। উপজেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব আনোয়ার বাহার সাবেক ছাত্রনেতা মোতালেবের দুর্ঘটনার বিষয়টি অবগত আছেন। জাতীয় নির্বাচন সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে হয়তো বিএনপি’র পক্ষ থেকে তার খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অসুস্থ শরীরেও ভোট দিতে যান
দুর্ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারলেও ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি মোতালেব।
তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রায় ১৭ বছর পর স্বাধীনভাবে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। শারীরিকভাবে দুর্বল থাকায় তিনি নিজে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারেননি।
তাঁর ছেলে এবং একজন আনসার সদস্যের সহযোগিতায় তাঁকে ইয়ারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ ভবনের দোতালায় ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তিনি।
মোতালেব বলেন,
“আমি যতই অসুস্থ থাকি না কেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে ভোট দিতে ভুল করিনি। আমার ছেলে ও একজন আনসারের সহযোগিতায় দোতলায় উঠে ভোট দিয়েছি। প্রায় ১৭ বছর পর স্বাধীনভাবে ধানের শীষে ভোট দিতে পেরে আমি আনন্দিত।”
‘নেতারা না দেখলেও আমি বিএনপি করাই আমার সান্ত্বনা’
মোতালেবের দাবি, এখনো অনেক দলীয় নেতার সঙ্গে পথে দেখা হলেও কেউ কেউ তাঁকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যান। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজনও তাঁকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও মন্তব্য করেন বলে জানান তিনি।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন , জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কেউ কেউ তাঁকে বলেন, বিএনপির একজন নিবেদিত কর্মী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অসুস্থতার সময় দলীয় নেতারা কেন পাশে দাঁড়ালেন না।
তবে এসব প্রশ্ন ও হতাশার মধ্যেও তিনি দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি, এবং মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে থাকতে চান।
মোতালেব বলেন,
“আমি বিএনপি করেছি এবং এখনো বিএনপি করি। বাস্তবতা হয়তো কষ্টের, কিন্তু বিএনপি করাই আমার সান্ত্বনা।”
বাইক দুর্ঘটনায় যতনা কষ্ট পেয়েছি তার চাইতে বেশি কষ্ট পেয়েছি আমার নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জায়নামাজে অংশ নিতে পারিনি।
তৃণমূল কর্মীদের প্রত্যাশা কোথায়?
রাজনীতিতে ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের কর্মীদের মূল্যায়নের প্রশ্ন নতুন নয়। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক কর্মী ব্যক্তিগত সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। কিন্তু অসুস্থতা বা দুর্দিনে দলের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে সহযোগিতা না পেলে তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
মোতালেবের ঘটনা সেই বাস্তবতার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার এবং শারীরিক দুর্ভোগের মধ্যেও তিনি দলীয় প্রতীকের প্রতি নিজের সমর্থন বজায় রেখেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো যেকোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের কর্মীরা অবহেলিত বোধ করলে তা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও কর্মীদের মনোবলে প্রভাব ফেলতে পারে।
মোতালেবের প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—বরং দীর্ঘদিনের একজন কর্মী হিসেবে অসুস্থ পায়ের আরো একটি জটিল অপারেশন করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য সেনবাগের গণমানুষের নেতা মাননীয় সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন ফারুক মহোদয় ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের মানবিক খোঁজখবর ও পাশে থাকার অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন।
মোঃ আবদুল মোতালেব
সাবেক সাধারণ সম্পাদক
৬ নং কাবিলপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল
বর্তমান নবাগত ১০ নং ইয়ারপুর ইউনিয়ন ৩ নং ওয়ার্ড বিএনপি।


