আবু রায়হান, মণিরামপুর (যশোর):
মাদকের ছোবলে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে উঠতি বয়সী তরুণেরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবনের প্রবণতা থেকে বাদ পড়ছে না তরুণীরাও। গ্রামপর্যায়ে মাদকের বিস্তার, মাদক কারবারের অভিযোগ এবং তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের মাদকাসক্তির ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলায়। মাদকের সহজলভ্যতা, এর উৎস এবং কারা এসব কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন বাসিন্দারা।
সার্চটুডে নিউজের অনুসন্ধানে উপজেলার ১৪ নম্বর দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের মাদক বিক্রির হটস্পট হরিণা ও বাটবিলা গ্রামে ইয়াবা ও গাঁজার কেনাবেচা নিয়ে অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত এবং তাঁদের কেউ কেউ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় থেকে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
মাদক কারবারের অভিযোগে বহুল আলোচিত সত্যজিৎ বিশ্বাস, উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণা গ্রামের খাঁপাড়ার বাসিন্দা কালাচাঁদ বিশ্বাসের ছেলে সত্যজিৎ বিশ্বাসের নাম উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইয়াবা ও গাঁজার কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নির্ভরযোগ্যসূত্র।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকের বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে তার প্রতি অসন্তোষ ও উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, মাদক ব্যবসায়ীকে নিষেধ করলেও হয় গোপনে না হয় প্রভাবখাটিয়ে তাদের কার্যক্রম চালায়।
মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের প্রত্যেকে শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ তারিখ রবিবার আনুমানিক রাত ২টা থেকে ২টা ৩০মিঃ এর মধ্যে সত্যজিৎ বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, মাদক কেনাবেচার সময় মাদকের বিষয় নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সেও স্থানীয়দের উপর উদ্যত হলে সেখানে তাদের মধ্য হাতাহাতির ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।
এর আগে স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাদক কারবারের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সার্চটুডে নিউজ। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে রাতদিন নিউজের মোজো রিপোর্টার ও সার্চটুডের স্টাফ রিপোর্টারের কাছে দেওয়া বক্তব্যে সত্যজিৎ বিশ্বাস নিজের অতীত জীবন, মাদক সেবন এবং মাদক ব্যবসা শুরুর বিষয়ে কিছু তথ্য তুলে ধরেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একসময় তিনি ভ্যানগাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সে সময় থেকেই গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করতেন বলে জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে নিজেই মাদক ব্যবসা শুরু করেন বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
সত্যজিৎ বিশ্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি পাশের একটি গ্রাম থেকে একজন মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হওয়ার পর এলাকায় মাদক কেনাবেচা না কি অনেকটা কমে গেছে এমন কী নেই বললেই চলে। (যা অনুসন্ধানকারীর কাছে ছিলো ভুতের মুখে রাম নামের মত)
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামপর্যায়ে মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে কিশোর ও তরুণেরা। শিক্ষাজীবনের শুরুতেই কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক, কর্মজীবন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে পরিবার ও সমাজের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, মাদক কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কিছু মাদকসেবী চুরি, ছিনতাই এবং গভীর রাতে বন্ধ দোকানে চুরির মতো বড় বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
হরিণা ও বাটবিলা গ্রামে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ সামনে আসার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে?
গ্রামপর্যায়ে ইয়াবা ও গাঁজা কীভাবে পৌঁছাচ্ছে? এসব মাদকের সরবরাহকারী কারা? স্থানীয় পর্যায়ে কারা বিক্রির সঙ্গে জড়িত? মাদক কারবারের পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না? আর এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কী তথ্য রয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, অর্থের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন বাসিন্দারা।
মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের উৎস শনাক্ত করা এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সদস্যদের সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কার্যক্রম, জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে তাদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা সহজ হবে।
মণিরামপুরের হরিণা ও বাটবিলা গ্রামে মাদক কারবারের অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ঝুঁকি থেকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।


