মোঃ হযরত আলী শান্ত,সাতক্ষীরা শ্যামনগর থেকে।।
সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধ, জলজ প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষার দাবিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছে নবীন-প্রবীণরা। সোমবার (১২ অক্টোবর) সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ‘বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করো, সুন্দরবনের প্রাণ রক্ষা করো’ স্লোগানে ‘বিষমুক্ত সুন্দরবন, নবীন-প্রবীণের আবেদন’ শীর্ষক কর্মসূচি থেকে এ আবেদন জানানো হয়।
বেসরকারি গবেষণা ও জাতীয় পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বারসিকের সহযোগিতায় গ্রীণ কোয়ালিশন, সংগঠিত জনসংগঠন, শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশন, সুন্দরবন ইয়ুথ সলিডারিটি টিম, সিরিও, শরুব এর যৌথ উদ্যোগে সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয় সম্মুখে আয়োজিত কর্মসূচিতে সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাত দফা দাবি জানানো হয়। আবেদনে বন বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদন পাঠ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গ্রীণ কোয়ালিশন শ্যামনগর পৌরসভার সভাপতি ও প্রাক্তন শিক্ষক কৃষ্ণানন্দ মুখার্জি।
”বিষমুক্ত সুন্দরবন, নবীন-প্রবীণের আবেদন” যৌথভাবে পাঠ করেন বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিমা আক্তার, মিস ঈশিতা ও মেহজাবিন সুলতানা। তাঁরা বলেন, সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে এ বনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের নদী ও খালগুলো মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং বিভিন্ন জলজ প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। কিন্তু এসব নদী-খালে কীটনাশক ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবেদনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিভাগের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের ৪১, ৪২, ৪৬, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ ও ৫৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণার বরাত দিয়ে আবেদনে আরও বলা হয়, সাতক্ষীরা রেঞ্জের মোট ১৪৭টি খালের মধ্যে ৩১টিতে সর্বাধিক, চারটিতে মাঝারি এবং ৩৩টিতে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার তথ্য পাওয়া গেছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিষ প্রয়োগের ফলে মাছের পোনা, ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষাক্ত রাসায়নিক নদী-খালের পানিতে ছড়িয়ে পড়লে মাছের প্রজনন, খাদ্যশৃঙ্খল ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিষাক্ত মাছ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। মাছের প্রাকৃতিক মজুত কমে গেলে বৈধভাবে মাছ আহরণকারী জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসব সমস্যা মোকাবিলায় আবেদনে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ খালগুলোতে বন বিভাগ, কমিউনিটি প্যাট্রলিং গ্রুপ (সিপিজি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত টহল ও আকস্মিক অভিযান পরিচালনা; বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ; বিষাক্ত রাসায়নিকের অবৈধ ব্যবহার ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ; বিষ প্রয়োগে ধরা মাছের সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ প্রতিরোধ; ঝুঁকিপূর্ণ খালের পানি ও জলজ প্রাণীর ওপর বিষের প্রভাব পর্যবেক্ষণ; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সমন্বিত সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা।
আবেদনে বননির্ভর জনগোষ্ঠী, জেলে, মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, যুবসমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি অভিযানের তথ্য, শনাক্ত অপরাধ এবং গৃহীত ব্যবস্থার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা গ্রীণ কোয়ালিশনের উপদেষ্টা সিনিয়র সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম. বেলাল হোসেন, বনবিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা মো. এরফান উদ্দীন, সাতক্ষীরা সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহমুদা খাতুন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন গ্রীণ কোয়ালিশন সভাপতি মো. মুহসিন বিল্লাহ, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন গ্রীণ কোয়ালিশন সভাপতি ডাঃ যোগেশ মন্ডল, ঈশ্বরীপুর ইউনিয়ন গ্রীণ কোয়ালিশন এর গোবিন্দ মন্ডল, দাতিনাখালী বনজীবি নারী উন্নয়ন সংগঠন এর সভানেত্রী শেফালী বিবি, বড়কুপট সবুজপাতা নারী সংগঠন এর সভানেত্রী পারুল রানী বৈদ্য, বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আইয়ুব আলী, বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শাহীন ইসলাম, সহযোগী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রামকৃষ্ণ জোয়ারদার প্রমুখ।
আবেদনকারীরা মনে করেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতা প্রতিরোধে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আবেদনকারীদের অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।


