ফাহিম হোসেন
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী’ পদে ব্যাপক বয়স জালিয়াতি ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও তৎকালীন এক অসাধু শিক্ষা কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অনিয়ম করা হয় বলে জানা গেছে। এই অবৈধ নিয়োগের বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও চাকরিপ্রত্যাশীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধান ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে রিয়াজুল নামের এক ব্যক্তিকে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী এই পদে যোগদানের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর হওয়ার কথা থাকলেও, রিয়াজুলের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
নিয়োগের নথিতে জমা দেওয়া জন্মসনদে রিয়াজুলের জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দ। তবে ৩ নম্বর সিংড়া ইউনিয়ন পরিষদের অনলাইন সার্ভার ঘেঁটে দেখা যায়, তার প্রকৃত জন্মতারিখ ২ জুলাই ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ। সরকারি ডাটাবেজের হিসাব অনুযায়ী, নিয়োগের সময় তার প্রকৃত বয়স ছিল প্রায় ৩৭ বছর ৭ মাস—যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।
শুধু বয়স জালিয়াতিই নয়, নিয়োগের জন্য রিয়াজুল কৃষ্ণরামপুর ফাজিল মাদ্রাসা থেকে অষ্টম শ্রেণি পাসের একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, উক্ত মাদ্রাসার নথিপত্রে এই ধরনের কোনো প্রত্যয়নপত্র ইস্যুর রেকর্ড সংরক্ষিত নেই। ফলে তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদটিও জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে।
এত বড় অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে কীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো—এমন প্রশ্নে বর্তমান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আফজাল হোসেন বলেন, “নিয়োগের সময় আমি এই উপজেলায় কর্মরত ছিলাম না। তবে লোকমুখে শুনেছি, তৎকালীন এক প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।”
এদিকে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান শিক্ষা অফিসার কীভাবে রিয়াজুলের চাকরি বারবার নবায়ন (রিনিউ) করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে ভুয়া কাগজপত্র থাকার পরও চাকরি নবায়নের বিষয়ে তিনি কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক চাকরিপ্রত্যাশী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু টাকা ও রাজনৈতিক প্রভাব না থাকায় আমরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আর জালিয়াতি করে বছরের পর বছর একজন পার পেয়ে যাচ্ছে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, বিগত সরকারের আমলের এই ধরনের নিয়োগ অনিয়মের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তারা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, অতীতে যেসব নিয়োগ জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং প্রকৃত যোগ্যদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া হোক।


