উমংনু মারমা
বান্দরবান প্রতিনিধি
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেতং খুমী পাড়ায় হামের প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ১৫ দিনে হামের উপসর্গে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার (২৮ জুলাই) বান্দরবান সদর হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে চার বছর বয়সী ফ্রেএং খুমীর মৃত্যু হয়। এর দুই দিন আগে একই পরিবারের তার বড় ভাই সাত বছর বয়সী প্রেটংএং খুমীও হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। দুই দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের দুই ভাইয়ের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে মারা যাওয়া সাত শিশু হলো—ফ্রেলে এ খুমী (৯), খ্রেপা খুমী (১৩), শইফ্রা খুমী (১৩), খ্রেতেম এং খুমী (৬), পলি এং খুমী (৭), প্রেটংএং খুমী (৭) ও ফ্রেএং খুমী (৪)। তারা সবাই রুমা সদর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম লেতং খুমী পাড়ার বাসিন্দা।
স্থানীয় বাসিন্দা অংসাই খুমী জানান, মৃত সাত শিশুর মধ্যে একজন সুইলুং খুমীর মেয়ে, চারজন তার নাতি-নাতনি এবং বাকি শিশুরা তার দুই ভাইয়ের সন্তান ও নিকটাত্মীয়। তিনি বলেন, দুজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নেওয়ার পথে, অন্যরা অসুস্থ অবস্থায় পাড়িতেই মারা গেছে। এখন কারও শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলেই কষ্ট করে হলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হচ্ছে।
অংসাই খুমী জানান, লেতং খুমী পাড়ায় প্রায় ২৮টি খুমী পরিবার বসবাস করে। বগালেক থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে সেখানে পৌঁছাতে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
সোমবার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে ভর্তি শিশুদের স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, আবার অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছে।
ফাইনন পাড়ার বাসিন্দা পারিং ম্রো জানান, তার সাত বছরের মেয়ের কয়েক দিন ধরে জ্বর, গলা, মুখ, পেট ও জিহ্বায় ব্যথা ছিল। হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
মংথোয়াইচিং কারবারি পাড়ার বাসিন্দা মেসাংথুই মারমা নিজেও হামে আক্রান্ত হয়ে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তিনি বলেন, তাদের পাড়ায় অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক হামের উপসর্গে ভুগছেন। অর্থাভাবে অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।
গালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের রুংরই পাড়ার বাসিন্দা পালে ম্রো জানান, পাঁচ দিন জ্বরে ভোগার পর শরীরে লালচে দাগ দেখা দিলে তার দুই সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
খুলাইন পাড়ার বাসিন্দা লংশৈ খুমী বলেন, গাজীপুরের একটি হোস্টেলে থাকা তার ছেলে হামে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর ভেষজ চিকিৎসায় সুস্থ না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
পাইন্দু ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক মংক্যচিং মারমা জানান, ঞংক্ষ্যংওয়া পাড়ায় এক শিশুর মৃত্যুর পর সবাইকে দ্রুত হাসপাতালে আসতে উৎসাহিত করা হয়। ওই পাড়া থেকে ভর্তি হওয়া ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন আগেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। সোমবার শেষ রোগীকেও ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন হচ্ছে, তাদের বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। সোমবার একসঙ্গে চার শিশুকে রেফার করা হয়। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন ধরে বিকল থাকায় রোগীদের স্বজনদের প্রায় পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া করে জিপে করে বান্দরবানে যেতে হয়েছে।
প্রায় প্রতিটি ঘরেই আক্রান্ত শিশু
ইউনিসেফের ভ্যাকসিনেটর কর্মী উথোয়াই সিং মারমা জানান, কয়েক দিন আগে লেতং খুমী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি ঘরেই শিশুরা হামের উপসর্গে আক্রান্ত। অনেক পরিবার আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, ৩০ থেকে ৩৫ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। টিকাদানের সময় তিনজন শিশুর অবস্থা সংকটাপন্ন দেখে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পরে হাসপাতালে আনার পথে একজন শিশুর মৃত্যু হয়।
প্রায় ১০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় ১০০ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ২২ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা শেষে ৬৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ১৩ শিশু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছে।
অন্যদিকে বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ২৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, চার বছর বয়সী ফ্রেএং খুমীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছিল। হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। পরে সেখানে পৌঁছানোর পর শিশুটির মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ
রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল হাসান বলেন, শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী ও ভ্যাকসিনেটর পাঠানো হয়। সেখানে কয়েকজন শিশুকে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যায়। দুর্গম পাহাড়ি পথে হাসপাতালে আনার সময় কয়েকজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, খুমী ও ম্রো জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার এখনও নিয়মিত টিকা নেয় না। বাইরে থেকে পড়াশোনা করে গ্রামে ফেরা কয়েকজন শিশুর মাধ্যমে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে এক সপ্তাহব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে টিকা কভারেজ কম এমন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হবে।
তিনি আরও জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন ধরে অচল। ১০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন রোগীকে খাবার সরবরাহ করতে হচ্ছে। এ জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে জেলা পরিষদের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী বলেন, দুর্গম এলাকায় শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার সব শিশুর টিকাদান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।


